বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত দুটি প্রধান সংবাদমাধ্যম—ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) এবং রেডিও ফ্রি ইউরোপ বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছেন।
মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে লিখেছেন, করদাতাদের টাকায় পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রয়োজন নেই। মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে হবে।
মাস্কের এই মন্তব্যের পর গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই প্রস্তাবকে অনেকেই রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ইলন মাস্ক প্রশাসনে কোনো দায়িত্ব পাবেন কি না, তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল। অবশেষে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ‘সরকারি দক্ষতা উন্নয়ন’ নামে একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাস্ককে।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব।
প্রসঙ্গত, মাস্কের এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) বন্ধের সম্ভাবনাও জড়িত বলে জানা গেছে।
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, এসব গণমাধ্যম কার্যত সরকারের প্রচারমাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি।
মাস্কের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক রিচার্ড গ্রেনেল। তিনি বলেন, গণমাধ্যম পরিচালনায় করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা অনৈতিক। গণমাধ্যমকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হতে হবে।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, ভয়েস অব আমেরিকা এবং রেডিও ফ্রি ইউরোপের মতো প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সংবাদমাধ্যম বিশ্বব্যাপী নিরপেক্ষ তথ্য সরবরাহের দাবি করে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
ভয়েস অব আমেরিকা ও রেডিও ফ্রি ইউরোপের ইতিহাস
উল্লেখ্য, ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত নাৎসি জার্মানির প্রচারণার বিরুদ্ধে সত্য প্রচারের জন্য চালু করা হয়েছিল। পরে এটি শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট দেশগুলোর জনগণের কাছে মার্কিন বার্তা পৌঁছানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, রেডিও ফ্রি ইউরোপ (আরএফই/আরএল) ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রচারণার জন্য ব্যবহৃত হতো। একসময় এটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো।
২০২০ সালে রাশিয়া এই গণমাধ্যমকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ২০২২ সালে এর সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে।
মাস্কের পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ
মাস্কের এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গণমাধ্যম বন্ধের উদ্যোগ জোরদার হতে পারে।
এদিকে, সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করা হলে সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহ ব্যাহত হবে।
ইলন মাস্ক ইতোমধ্যে মিডিয়া জগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছেন। এক্স অধিগ্রহণের পর তিনি সংবাদ পরিবেশনার নীতি পরিবর্তন করেছেন এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এখন তিনি সরকারি অর্থায়ননির্ভর সংবাদমাধ্যম নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সূত্র : আনাদুলু এজেন্সি
মন্তব্য করুন