সম্পদের রাজ্যে বিস্ময়কর এক দেশ ইরান। দেশটির হাতে রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তেল। এই তেলসম্পদের ওপর ভর করেই টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি। এ কারণেই বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছে তেহরান।
তেলের ইতিহাস
ইরানে প্রথম তেলের আবিষ্কার হয় ১৯০৮ সালে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মসজিদ-ই-সোলেইমান এলাকায় পাওয়া যায় এই তেলের খনি, যা ব্রিটিশরা আবিষ্কার করেছিল। তখন থেকেই আলোচনায় আসে ইরানের তেলসম্পদ।
তেলের বিশাল ভাণ্ডার
ইরানে তেলের মজুদ প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ব্যারেল। তেল মজুদের দিক থেকে এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। দেশটির প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো হলো- আহভাজ, গাছসারান, আজাদেগান ও মারুন। এই বিশাল তেলভাণ্ডারগুলোই ইরানের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ।
অর্থনীতি ও তেল
ইরানের অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভর করে তেলের ওপর। রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই তেল বিক্রির মাধ্যমে। তবে, এ নির্ভরতা ইরানের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। কারণ, তেলের দাম কমলে অর্থনীতিতে পড়ে নেতিবাচক প্রভাব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিষেধাজ্ঞা
ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ বহু পুরোনো। দেশটির এই প্রকল্প বন্ধে শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যার তাৎক্ষণিক প্রভাবে ধুঁকতে থাকে ইরানের অর্থনীতি। কিন্তু ইরান তার তেলসম্পদ রক্ষায় বেশকিছু কৌশল অবলম্বন করে। যার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেল রপ্তানি করছে তেহরান।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইরানের তেল রপ্তানি কৌশল
ইরানের রপ্তানি কৌশলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র গোপন নৌবহর। ইরান একটি গোপন নৌবহর ব্যবহার করে, যেগুলোকে ‘ঘোস্ট শিপ’ বলা হয়। এই জাহাজগুলোর মালিকানা ও চলাচল গোপন রাখে, যাতে তারা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে পারে। সম্প্রতি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান- ইউএএনআই ৩৮৩টি জাহাজকে চিহ্নিত করেছে, যেগুলো গোপনে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন দেশে ইরানের তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে।
অন্য দেশের তেলের সঙ্গে মিশ্রণ অন্য দেশের তেলের সঙ্গে নিজেদের তেল মেশায় ইরান। এরপর চীনের পরিশোধনাগারগুলো এই মিশ্রিত তেল গ্রহণ করে। যা সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য উৎস থেকে আমদানির নামে চীনে প্রবেশ করে। এই পদ্ধতি ইরানকে তেল বিক্রি করার সুযোগ দেয়।
জাহাজের নাম ও পতাকা পরিবর্তন
ইরান নিয়মিত তাদের তেলবাহী জাহাজের নাম ও পতাকা পরিবর্তন করে। এতে জাহাজগুলো শনাক্ত করা এবং এগুলোর ওপর নজরদারি করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে, এই জাহাজগুলো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়।
জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা
ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলো ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে বা জাহাজের অবস্থান গোপন রাখে। এতে জাহাজগুলো ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না। ফলে, এগুলো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে দেদারসে বাণিজ্য চালিয়ে যায়।
বার্টার সিস্টেম
ইরান তেলের বিনিময়ে চীনের কাছ থেকে পণ্য গ্রহণ করে। এটি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি মাধ্যম। চীন ইরানের তেল ক্রয় করে এবং বিনিময়ে তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী দেয়। এতে তেলের জন্য সরাসরি অর্থের লেনদেন হয় না।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মাধ্যমে বিক্রয়
ইরান তার তেল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মাধ্যমে বিক্রি করে। এই দেশগুলো ইরানের তেল কিনে নিজেদের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিশ্ববাজারে বিক্রি করে। এতে ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে।
মন্তব্য করুন