বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তোলপাড় ভারতের রাজনৈতিক মহল। চীন সফরে এক বক্তৃতায় ড. ইউনূস বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ৭টি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) সম্পূর্ণরূপে স্থলবেষ্টিত। ফলে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে সমুদ্রের অভিভাবক।
প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের রাজনীতিবিদরা। এমনকি বাংলাদেশকে ভেঙে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ভারতীয় এক নেতা। মঙ্গলবার ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল ত্রিপুরা মোথা পার্টির শীর্ষ নেতা প্রদ্যুৎ মাণিক্য দেববর্মা এ হুমকি দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বার্তায় প্রদ্যুৎ বলেন, উত্তরপূর্ব ভারতের সঙ্গে ভারতের বাকি অংশের যোগাযোগ উন্নত করার প্রয়োজন নেই, বরং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলটি যদি দখল করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা কাটবে— অন্যদিকে সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্য নিজেদের ব্যবহারের জন্য একটি সমুদ্রবন্দর পাবে।
গত ২৬ মার্চ চীন সফরে গিয়েছিলেনে ড. ইউনূস। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এটি ছিল তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন।
সেখানে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক এবং বাংলাদেশ অন্যদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।’ প্রধান উপদেষ্টার এ মন্তব্য ভারতের রাজনৈতিক নেতা ও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
ড. ইউনূসের এই মন্তব্যর প্রথম প্রতিক্রিয়া জানান সেভেন সিস্টার্সের অন্যতম রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের এই মন্তব্য ভারতের কৌশলগত চিকেন’স নেক কডিডোরের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।
পোস্টে তিনি বলেন, এই মন্তব্যগুলো করিডোরের দুর্বলতা নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের দীর্ঘদিনের প্রচারণাকে মদদ দেবে। উত্তর-পূর্বকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করতে শক্তিশালী রেল ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এ ব্যপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যও আহ্বান জানান তিনি।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার প্রতিক্রিয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানান ত্রিপুরার রাজপরিবারের অন্যতম উত্তরাধিকারী এবং বর্তমানে বিজেপির অন্যতম জোটসঙ্গী ত্রিপুরা মোথার শীর্ষ নেতা প্রদুৎ মাণিক্য দেববর্মা। এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দখলের হুমকি দেন তিনি।
প্রদ্যুৎ বলেন, ‘ভারতের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর পাকিস্তানকে ছেড়ে দেওয়া, কারণ চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের লোকজন আমাদের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল, ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হতে চেয়েছিল। এখন সেই ভুল সংশোধনের সময় এসেছে।’
তিনি লেখেন, ‘সেই আদিবাসী জনগণের সহায়তা নিয়ে আমরা সমুদ্রে যাওয়ার পথ তৈরি করতে পারি। জনাব ইউনূস নিজেকে সমুদ্রের অভিভাবক ভাবতেই পারেন, কিন্তু সত্য হলো— তিনি একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং তার বয়স প্রায় ৮৫। এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে চট্টগ্রাম থেকে ত্রিপুরার দূরত্ব মাত্র কয়েক মাইল।’
প্রদ্যুৎ বলেন, ‘সড়ক ও রেল যোগাযোগের জন্য কোটি কোটি রুপি খরচ না করে আমরা বাংলাদেশকে ভেঙে সমুদ্রপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি। বাংলাদেশে লাখ লাখ ত্রিপুরা, গারো, খাসি ও চাকমা জাতিগোষ্ঠীল লোকজন বসবাস করে। তারা ১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ হতে চেয়েছিল। বর্তমানে তারা ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। যদি আমরা অগ্রসর হই, তাহলে তাদের নিজেদের স্বার্থেই তারা আমাদের পাশে দাঁড়াবে।’
মন্তব্য করুন