তুরস্কে ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুর গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে পাঁচ দিন ধরে চলা বিক্ষোভে এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ইমামোগলু প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলি ইয়ারলিকায়া জানিয়েছেন, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত মোট এক হাজার ১৩৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আমাদের রাস্তাগুলোকে আতঙ্কের পরিবেশে পরিণত করা এবং জাতির শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করার কোনো প্রচেষ্টাই বরদাশত করা হবে না।
গণতন্ত্রের দাবিতে তুর্কি তরুণদের ক্ষোভ
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণরা বলছেন, ইমামোগলুর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তুরস্কের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইস্তানবুলের রাস্তায় দুই তরুণ বিক্ষোভকারীর সঙ্গে কথা হয় সাংবাদিকদের।
এক তুর্কি তরুণী বলেন, আমাদের ভোটের অধিকার আছে, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আছে আমাদের নেতা নির্বাচনের। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আমাদের সেই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন।
আরেক তুর্কি তরুণ বলেন, আমরা গণতন্ত্র চাই। আমরা চাই জনগণই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করুক। আমাদের এমন একটা দেশ চাই, যেখানে কাউকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা হবে না।
ইমামোগলুর গ্রেপ্তার ও তুরস্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতি
গত মঙ্গলবার দুর্নীতির অভিযোগে ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তুরস্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাকে মেয়রের পদ থেকেও বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে তার গ্রেপ্তার সত্ত্বেও তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ইমামোগলুকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। যদিও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
বিক্ষোভ ও পুলিশের দমনপীড়ন
২০১৩ সালের গেজি আন্দোলনের পর এটিকে তুরস্কের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এএফপির তথ্যমতে, তুরস্কের ৮১টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ৫৫টি প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সোমবার রাতে ইস্তানবুলে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বিক্ষোভের নিন্দা জানিয়ে বিরোধী দল সিএইচপির বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তুলেছেন।
এদিকে, ইউরোপীয় কমিশন তুরস্ককে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের মুখপাত্র গিয়োম মের্সিয়ে বলেন, আমরা চাই তুরস্ক ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকুক, তবে এর জন্য গণতান্ত্রিক আদর্শ ও চর্চার প্রতি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
তুরস্কের প্রতিবেশী গ্রিসও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, আইনের শাসন ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান নিশ্চিত না করলে এটি পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তুরস্কে বিক্ষোভের আগামীর দিক নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। দেশটির ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য এই আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে।
মন্তব্য করুন