ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন ভিয়েতনামের নারী ধনকুবের ট্রুং মাই ল্যান। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ১১ বছর ধরে দেশটির বড় একটি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ডলার লুটের দায়ে তাকে এ সাজা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) হো চি মিন সিটির ঔপনিবেশিক যুগের একটি আদালত তাকে এ রায় দেন। এ ঘটনাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা এটি।
ট্রুং মাই ল্যান নামের ওই নারীর বিরুদ্ধে দেশটির সাইগন কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে চার হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এরমধ্যে দুহাজার ৭০০ কোটি ডলার পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। এ ঘটনায় ২ হাজার ৭০০ জনকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। মামলায় মোট আইনজীবী ছিলেন ২০০ জন। তাদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের ছিলেন ১০ জন।
সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচিত এ ঘটনার প্রমাণ ১০৪টি বক্সে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মোট ওজন হবে ছয় টন। মামলায় তিনি ছাড়াও আরও ৮৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তবে সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন তারা।
মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় আদালত আসামিদের সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। এরমধ্যে চারজনের যাবজ্জীবন ও অন্যদের শর্তসাপেক্ষে তিন থেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রুং মাই ল্যানের স্বামীকে ৯ বছর এবং তার ভাতিজির ১৭ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডেভিড ব্রাউন বলেন, কমিউনিস্ট শাসনামলেও এমন বিচার হয়েছে বলে আমার মনে হয় না এবং ধরনের অপরাধও আগে কখনও ঘটেনি।
হো চি মিন সিটির একটি সিনো-ভিয়েতনামি পরিবার থেকে এসেছেন ট্রুং মাই ল্যান। এলাকাটি আগে সাইগন হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি দীর্ঘদিন ভিয়েতনামের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। সেখানেই ট্রুং মাই ল্যানের বেড়ে ওঠা।
মায়ের প্রসাধনীর ছোট্ট দোকান দিয়ে নিজের জীবন শুরু করেছিলেন এই নারী। ১৯৮৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অর্থনৈতিক সংস্কার শুরুর পর জমি ও সম্পত্তি কেনা শুরু করেন তিনি। এরপর ১৯৯০ সালের দিকে একটি বড় হোটেল ও রেস্টেুরেন্টের মালিক হন ট্রুং। জমি ও আবাসন ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করতে থাকেন তিনি। রাষ্ট্রীয় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে এর সুবিধা নিয়ে সরকারি জমি ব্যবহারের সুবিধাও নেন এই নারী।
২০১১ সাল পর্যন্ত ট্রুং হো চি মিন সিটির সুপরিচিত ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তাকে ৩টি ছোট ব্যাংককে এটি বৃহত্তর সত্তায় রূপান্তরের অনুমতি দেয় সাইগন কমার্শিয়াল ব্যাংক।
ভিয়েতনামের আইনানুসারে ব্যাংকে পাঁচ শতাংশের বেশি শেয়ারের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, শত শত শেল কোম্পানি ও তার প্রক্সি হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের মাধ্যমে ট্রুং সাইগন ব্যাংকের ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিজের দখলে নেন। শুধু তাই নয়, নিজের লোকদের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এরপর নিজের নিয়ন্ত্রিত শেল কোম্পানির নেটওয়ার্কে শত শত ঋণ অনুমোদনের আদেশ দেন তিনি।
আইনজীবীদের মতে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিন বছরের মধ্যে নিজের গাড়িচালককে দিয়ে ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার তুলে নিজের বেজমেন্টে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। এ টাকা ভিয়েতনামের মুদ্রায় ১০৮ ট্রিলিয়ন ডং। দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যাংক নোটে এ অর্থের ওজন হবে দুই টন।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রুং যে ঋণ দিয়েছেন তা কখনো যাচাই করা হয়নি। ঋণ যাচাইবাছাইয়ের জন্য তিনি বড় অঙ্কের ঘুষ দিতেন। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান পরিদর্শকসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৫০ লাখ ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মন্তব্য করুন