বিএনপি সংস্কারের কথা ২০১৬ সালের ভিশন-২০৩০ থেকে বলে আসছে জানিয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেছেন, বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটিই সংস্কারের প্রথম রূপরেখা। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সংস্কারের প্রধান প্রস্তাবক ও ধারক বিএনপি ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবে বর্তমানেও বেশিরভাগ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে দলটি একমত।
শনিবার (০৫ এপ্রিল) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি। ড. মাহদী আমিনের নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
বয়ান বনাম বাস্তবতা
(১) বয়ান : বিএনপির অবস্থান সংস্কারের বিরুদ্ধে।
বাস্তবতা : বিএনপি সংস্কারের কথা ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০ থেকে বলে আসছে এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটিই সংস্কারের প্রথম রূপরেখা। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সংস্কারের প্রধান প্রস্তাবক ও ধারক বিএনপি ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবে বর্তমানেও বেশিরভাগ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে দলটি একমত।
তবে কিছু তাত্ত্বিক, উচ্চাভিলাষী ও পরীক্ষামূলক প্রস্তাবনা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন এবং নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণকারী কিংবা সরকারে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে এমন প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে। বিএনপি সবসময়ই বাস্তবমুখী এবং টেকসই সংস্কারের পক্ষে। যেসব ফর্মুলা কোথাও পরীক্ষিত নয়, বিএনপি এমন আইডিয়া নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার পক্ষপাতী নয়।
(২) বয়ান : বিএনপি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রদান, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, আর্টিকেল ৭০-এর সংশোধন ইত্যাদি চায় না।
বাস্তবতা : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রণীত ২০২২ সালের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের ৩১ দফায় উপরোক্ত প্রতিটি বিষয় সর্বস্তরে উত্থাপিত হয়েছিল এবং সেই আলোকেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাবনা এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মাইনর মেথডোলজিক্যাল ডিফারেন্স রয়েছে, যেখানে বিএনপির অবস্থান ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেম পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
বিএনপি অর্থবিল, অনাস্থা ভোট এবং সংবিধান সংশোধন ব্যতীত সব ক্ষেত্রে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে একমত। কিন্তু অনাস্থা ভোটেও ফ্লোর ক্রসিং-এর সুযোগ রেখে পাকিস্তান আমলের মতো অস্থিতিশীল সরকার এবং হর্স ট্রেডিং (সংসদ সদস্য কেনাবেচা)-এর যুগে ফিরতে চায় না। ব্যাখ্যাতীতভাবে ন্যাশনাল কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন করে, বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী পদ এবং সংসদ উভয়ই গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, যার ফলে নির্বাচনের জনমতও অগ্রাহ্য বিবেচিত হতে বাধ্য। তথাপি, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের মডেল কিংবা সাংবিধানিক পদগুলোর ক্ষমতার হ্রাস-বৃদ্ধিসহ সব ক্ষেত্রে, যে কোনো যৌক্তিক আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
(৩) বয়ান : বিএনপি সংস্কার কমিশনগুলোর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে একমত না।
বাস্তবতা : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ৬টি সংস্কার কমিশনের প্রতিটি গঠিত হয়েছে ৩১ দফায় বিএনপি যে সংস্কার কমিশনগুলোর কথা বলেছে, ঠিক সেই ভাবে ও সেই নামে এবং সব কমিশনেই বিএনপি থেকে সুনির্দিষ্ট মতামত প্রদান করা হয়েছে। যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সব সুপারিশের সঙ্গে বিএনপি যেমন একমত পোষণ করেছে, তেমনি কিছু অদ্ভুত ও অবাস্তব সুপারিশের সঙ্গে ভিন্নমত দিয়েছে, সেটিই স্বাভাবিক। বিএনপি বিচার বিভাগ সংস্কারের ২৩টি সুপারিশের ২০টিতে একমত, দুদক সংস্কারের ২০টি সুপারিশের ১৯টিতে একমত, জনপ্রশাসন সংস্কারের ২৬টি সুপারিশের অর্ধেকে একমত।
সংবিধান ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের কিছু সুপারিশের ক্ষেত্রে বিএনপির দ্বিমত রয়েছে, যেগুলো নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ার খর্ব করে, নির্বাচিত সংসদ ও প্রধানমন্ত্রী পদটিকেও কম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ : সবগুলো সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া, অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগও এনসিসির হাতে ন্যস্ত করা। এছাড়াও সংসদীয় গণতন্ত্রের মডেলের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে আরও যেসব ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবনা এসেছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যের বদলে টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে।
(৪) বয়ান : সুলিখিত সংস্কার প্রস্তাবনার মাধ্যমেই জনগণ গণতন্ত্র চায়।
বাস্তবতা : সংস্কারের মাধ্যমে সংবিধানের কয়েকটি বাক্যের পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে হবে, জীবনের সমস্যার সমাধান হতে হবে। বিএনপি মনে করে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কেতাবি কিংবা পুঁথিগত সংস্কারের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার এবং আচরণের ব্যবহারিক প্রয়োগ। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, জনগণের গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়েই কেবল সে সংস্কার টেকসই, সফল এবং কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
বিএনপিই একমাত্র দল, যেটি বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, থানা, ওয়ার্ড ও মহল্লায় ৩১ দফার মাধ্যমে সংস্কারের পরিপূর্ণ রূপরেখা নিয়ে গত ৬ মাসে ছুটে গিয়েছে এবং এর সমর্থনে জনমত তৈরি করেছে। জনগণ কি চায়, কতটুকু সংস্কার নির্বাচনের আগে আর কতটুকু সংস্কার নির্বাচনের পরে প্রয়োজন, সে ধারণাটুকু সত্যিকার অর্থে বিএনপির মতো আর কারও নেই। বাস্তবতা হলো, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংস্কার শেষ করে খুব দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা আজ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা।
(৫) বয়ান : আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন- এমনটিই হওয়া উচিত।
বাস্তবতা : বর্তমানে সংস্কার এবং নির্বাচনকে যেভাবে মুখোমুখি করে ফেলা হয়েছে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। যারা সংস্কার শেষ করার পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছেন, তাদের উপলব্ধি করা উচিত, যেটি শেষ হয়ে যায় সেটি সংস্কার নয়। কারণ সংস্কার কখনো শেষ হয় না, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে নির্বাচনের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
তবে রাষ্ট্রের যে কোনো মৌলিক সংস্কার করতে নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত ও জনকল্যাণের জন্য সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করে যারা বিজয়ী হবেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় সেই সরকার একটি রোডম্যাপ প্রদান করবে। তারা গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন এবং ইশতেহার অনুযায়ী সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করবেন- এটিই গণতান্ত্রিক রীতি।
মন্তব্য করুন