চলতি বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের খবর শুনে সেদিন কিশোর সাহাদাত বিজয় মিছিলে যোগ দেয়। এর আগে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময়ে নানিকে বলে গেছে, তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরবে। ফিরেছে সাহাদাত, তবে লাশ হয়ে। নানাবাড়িতে সে মানুষ। তাই সেদিন থেকে নানির কান্না যেন থামছেই না।
জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট বিকেলে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার সামনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন সাহাদাত হোসেন (১৬)। ছোটবেলা থেকেই নানার বাড়িতে বড় হয়েছেন এই কিশোর। শহীদ হওয়ার পরে দাফনও হয়েছে ওই বাড়িতে।
সাহাদাতের নানি মমতাজ বেগম কাঁদতে কাঁদতে বারবারই বলছেন, বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় বলেছে ‘নানু আমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসব। নানু আমার ফিরেছে, কিন্তু লাশ হয়ে। শেষবারের মতো আর কথা হয়নি নাতির সঙ্গে।
পারিবারিক কারণে ছোটবেলা থেকে অবহেলিত নাতি আমার শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেল পরপারে।
সম্প্রতি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের বালিথুবা গ্রামের বেপারীতে গিয়ে কথা হয় সাহাদাতের স্বজনদের সঙ্গে। ওই বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে তাকে।
কথা বলে জানা গেছে, সাহাদাতের মা শিরতাজ বেগমের প্রথমে বিয়ে হয় বরিশালের খলিলুর রহমানের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই বাবার বাড়িতেই থাকতেন শিরতাজ। পরে কর্মের জন্য চলে যান ঢাকা। সাহাদাতের জন্ম হয় নানা বাড়িতে। পারিবারিক কলহের কারণে স্বামী শিরতাজকে ছেড়ে চলে যায়। পরে কয়েকবছর অপেক্ষা করে স্বামীকে তালাক দেন শিরতাজ। এরপর আবার বিয়ে হয় লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার বাসিন্দা আমির হোসেনের সঙ্গে।
আমির হোসেন পেশায় কবিরাজ। শিরতাজ বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।
এ কারণে বেশিরভাগ সময় নানির কাছেই বড় হয়েছেন শহীদ সাহাদাত হোসেন। নাতির মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন নানি মমতাজ বেগম।
তিনি বলেন, তার মা শিরতাজ আমার মেয়ে। নাতির জন্ম হয়েছে আমাদের বাড়িতে। সাত বছর বয়সে তাকে চাঁদপুরে একটি কওমি মাদ্রাসায় পড়তে দেই।
সেখানে দুই বছর পড়ার পরে চলে আসে বাড়িতে। এরই মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয় খলিল কবিরাজের সঙ্গে। এরপর তাদের চান্দ্রা বাড়িতে কিছুদিন তাদের সঙ্গে ছিল আমার নাতি। ওই বাড়িতে একা থাকতে সমস্যা হওয়ার কারণে আমার কাছে চলে আসে। এরপর কয়েক বছর আমাদের বাড়িতেই ছিল।
তিনি বলেন, সাহাদাতের বয়স ১৬ হলেও নাতি আমার দেখতে অনেক সুন্দর ও লম্বা হয়েছে। কিছুদিন আগে ফরিদগঞ্জ শহরে একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নেয়। সেখানে কাজ করত এবং মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এসে থাকত। সর্বশেষ ২ আগস্ট আমাদের বাড়ি থেকে ফরিদগঞ্জ কাজে চলে যায়। যাওয়ার সময় আমাকে বলে, নানু আমি সোমবার বাড়িতে আসব। কিন্তু নাতি আমার এসেছে লাশ হয়ে। কীভাবে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারিনি।
সাহাদাতের মামা সোহাগ হোসেন ব্যাপারী বলেন, গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ফরিদগঞ্জ থেকে লোকজন ফোন করে জানায় আপনার ভাগনে সাহাদাত মাথায় গুলি খেয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। খবর শুনে সন্ধ্যার পরে তার মা শিরতাজসহ চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে চলে যাই। সেখানে তাকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, লোকজনের কাছ থেকে জানতে পেরেছি শেখ হাসিনার পতনের খবর শুনে লোকজন মিছিল নিয়ে নামে। ওই মিছিলে সাহাদাতও ছিল। থানার পাশে মন্দিরের সামনে সাহাদাত পুলিশের গুলিতে আহত হয়।
তিনি আরও বলেন, সাহাদাতের লাশ রাতেই বাড়িতে নিয়ে আসি। পরদিন সকালে বাড়ির সামনে নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। গত এক সপ্তাহ আগে সাহাদাতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে তোলা হয়। থানা পুলিশ এসে তার বিষয়ে তদন্ত করে। তদন্ত শেষে আমরা নিজেরা তার লাশ দাফন করি।
সাহাদাতের নানা কলিম উল্লাহ ব্যাপারী বলেন, আমার নাতি খুবই দুর্ভাগা। সে ঠিকমতো তার বাবা-মায়ের আদর পায়নি। তাদেরকে রেখে বাবা চলে গেছে অন্যত্র। মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার নাতির শাসন কিংবা আদর করার একান্ত কেউ ছিল না। আমরা গরিব। কৃষি কাজ করে সংসার চলে। যতটুকু সম্ভব নাতিকে লালন পালনের চেষ্টা করেছি।
তিনি আরও বলেন, সাহাদাত শহীদ হওয়ার পরে এ পর্যন্ত অনেক লোকজনই এসেছে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল বিএনপির এম এ হান্নান ও লায়ন হারুনর রশীদ কিছু আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আর ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদেরকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছে। আমার এই ছোট নাতিকে কেনো গুলি করে হত্যা করা হলো আমি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর বিচার চাই।
সাহাদাতের সৎ বাবা আমির হোসেন কবিরাজের (৬০) সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে জানান, আমার বিয়ের পরে মাঝে মাঝে সে আমাদের কাছে থেকেছে, আমি যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করেছি। আমাদের ফরিদগঞ্জের বাসায় আসত, আমি নিজেই তাকে ফরিদগঞ্জ বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নিয়ে দিয়েছি।
সাহাদাতের মা শিরতাজ বেগম (৪০) এর সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে তিনি বলেন, আমার ছেলেটা খুব অসহায় ছিল। সাহাদাত আমার পেটে আসার ছয় মাস পর থেকেই তার আসল পিতা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার জন্য আট বছর অপেক্ষা করে আমি পরে আবার বিয়ে করেছি। কিন্তু আমাকে ছেলেসহ বিয়ে করার জন্য বর্তমান স্বামীর আগের সন্তানরা বাড়িতে উঠতে দেয় না। তাই বিভিন্ন জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। এখন ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদরের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকি। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে ছেলেটাকে ঠিকমতো পড়াতেও পারিনি। হেফজখানায় দিয়েছিলাম। কিন্তু সে মনোযোগী না হওয়ায় সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছে। মাত্র কাজ শিখতে দোকানে চাকরি নিয়েছিল। এই ছেলেটা ছিল আমার সম্বল। এখন তাকে ছাড়া আমি কী নিয়ে বাচঁব বলেন?
আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। দোষীদের শাস্তি চাই। সরকারের কাছে সহায়তা চাই। আমার ঘরবাড়ি কিছু নেই। বাবা-মার সঙ্গেও বিরোধ। স্বামীর আগের সন্তানদের সঙ্গেও বিরোধ। এই অবস্থায় কই যাব আমি? সরকারের কাছে তাই আমার আবেদন, আমাকে সাহায্য করুন। সহায়তা ছাড়া আমার বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই।
মন্তব্য করুন