৪১তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি বালুচর গ্রামের মো. সুলতান মিয়ার ছেলে। নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে সাইফুল বলেন, ‘সত্যি বলতে, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মূলত আমার বাবা চেয়েছেন আমি একজন বড় বিসিএস অফিসার হবো। কিন্তু তিনি তা দেখে যেতে পারেননি। গত নভেম্বরে তার মৃত্যু হয়েছে। আমার প্রয়াত বাবা কখনো বিদ্যালয়ে যাননি, কিন্তু তিনি তার সব সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। আজ আমি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি, কিন্তু বাবা নেই। এই আক্ষেপ এবং শূন্যতা কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব না। তাই সে জায়গা থেকে আমার অনুভূতি বলে বোঝাতে পারব না। তবে আমার মা বেঁচে আছেন। তিনি এবং পরিবারের অন্য সবাই বেশ আনন্দিত আমার এই অর্জনে। কিন্তু আমার বাবা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে এই আনন্দটা আমি আরও দারুণভাবে অনুভব করতে পারতাম।’
ছোটবেলায় কি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলায় তো আমরা আসলে একেক সময় একেকটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করি। গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা। তাই বাবা চেয়েছিলেন আমরা যেন অন্তত সুশিক্ষায় শিক্ষিত হই। তিনি তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। তারপর আমার বড় ভাই যারা আছেন তারা তাদের সর্বোচ্চ শ্রম দিয়েছেন আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কি হবো, সেই স্বপ্নটা না দেখে উচ্চ শিক্ষায় কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারব শুধু সেই চেষ্টাটাই সবসময় করেছি। তবে পড়াশোনার একপর্যায়ে আমার ইচ্ছে জেগেছিল আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো হওয়ার কারণে আমার পরিবার বিজ্ঞান বিভাগেই আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করার সুযোগ পাই। তারপর বাবা যখন আমাকে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখার ইচ্ছে পোষণ করেন, তখন থেকেই এটিকে আমার ধ্যানজ্ঞান বানিয়ে ফেলি।’
জীবনে চলার পথে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে- এমন প্রশ্নে সাইফুল বলেন, ‘আমার জীবনের অনুপ্রেরণা আলাদা করে যদি কাউকে বলতে হয় তা হলো আমার বাবা-মায়ের দুই জোড়া চোখ। যখনই কোনো জায়গায় হোঁচট খেতাম বাবা-মায়ের চেহারা দুটি মনে করতাম। তাদের চোখ দুটির ভাষা বোঝার চেষ্টা করতাম। আমার মনে এমন একটি ক্ষুধা কাজ করত, যেন আমি আমার বাবা-মাকে সম্মানিত করতে পারি। তাদের চাওয়াগুলো নিজের চাওয়াতে পূরণ করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।’
আগামীতে যারা বিসিএস-এ অংশ নিতে যাবেন তাদের উদ্দেশে সাইফুল বলেন, ‘আসলে তাদের উদ্দেশে তেমন করে বলার কিছু নেই। তবুও দুই একটি কথা বলতে চাই। অনেকে আমার কাছে এ বিষয়ে জানতেও চেয়েছেন। যদি বিসিএস অফিসার হতে চান তাহলে অবশ্যই ধৈর্য ধরতেই হবে। নিজের শক্তিকে নিজের করে নিতে হবে। চিন্তা-চেতনা সব সঠিক পথে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। পড়াশোনা করে যেতে হবে। জানার কোনো শেষ নেই। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা দিয়েই সবকিছু হয় না। এর বাইরেও আমাদের জানার আছে। সাহস রাখতে হবে।’
২০১০ সালে খাসমহল বালুচর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি-তে জিপিএ-৫ এবং ২০১২ সালে ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি-তে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হোন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সাইফুল ইসলাম পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) ওয়েবসাইটে ৪১তম বিসিএসের ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ২ হাজার ৫২০ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন মুন্সীগঞ্জের ছেলে সাইফুল ইসলাম।
মন্তব্য করুন