গ্রাম-বাংলার আবহমান ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। যান্ত্রিক যানের কবলে সেই ঐতিহ্য প্রায় হারাতে বসেছে। এখন গ্রামে গঞ্জে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন নেই বললেই চলে, এর প্রচলন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই ঘোড়ার গাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহন। এখন ঘোড়াও খুব বেশি চোখে পড়ে না। বছর পাঁচ আগে রাস্তায় ঘোড়া দেখা গেলেও এখন দেখাই মেলে না ঘোড়ার। কিন্তু এই ঘোড়ার গাড়িই এখন যেন পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুকনো মৌসুমে পদ্মার পাড়ের বিশাল এলাকাজুড়ে জেগে উঠেছে চর। এই মৌসুমে পানি কমে গেছে পদ্মা নদীতে। একে তো রাস্তাঘাট নেই, তার ওপর আবার যান্ত্রিক গাড়ি, ভ্যান-রিকশা, অটো কিংবা মাইক্রোও চলাচল করতে পারে না এই চরাঞ্চলে। এ সময় তাই ফরিদপুরের সদরপুরে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে চলাচল ও পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি। নিত্য ও কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে যাতায়াত ও অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যও ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হয় এখানে।
পদ্মা ঘিরে রেখেছে সদরপুর উপজেলার চর নাসিরপুর, চর মানাইর, ঢেউখালি ও নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়নকে। শুকনো মৌসুমে এ অঞ্চলে জেগে ওঠে অসংখ্য চর। এমন একসময় ছিল যখন কোনো পরিবহন না থাকায় মানুষকে হেঁটে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে উত্তপ্ত দীর্ঘ বালুচর পাড়ি দিতে হতো, নিত্যপণ্য কৃষিপণ্যের বোঝা ঘাড়ে মাথায় করে চরে জমে থাকা হাঁটুপানির মধ্যদিয়ে হাঁটতে হতো। তবে ঘোড়ার গাড়ি চালু হওয়ার পর এই কষ্ট থেকে অনেকটাই মুক্তি মিলেছে মানুষজনের।
প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ি চালানো জীবিকা নির্বাহের নতুন এক উপায় হয়ে উঠেছে অনেকের। বর্ষা মৌসুমে চরের মানুষজন নৌকায় যাতায়াত করতে পারে। তবে রাস্তাঘাট না থাকার কারণে শুকনো মৌসুমে চরম বিপাকে পড়তে হয় চরের মানুষকে। এই টাট্টু ঘোড়ার গাড়ি তাদের মুক্ত করেছে এই সমস্যা থেকে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তাদের কৃষিসহ নিত্যপণ্য পরিবহন করছেন এই ঘোড়ার গাড়িতে। অসুস্থ মানুষজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার হচ্ছে এই অযান্ত্রিক গাড়ি। চরাঞ্চলের মানুষের এই অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যমও হয়ে উঠেছে এই গাড়ি।
সদরপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়ার চরাঞ্চলের ঘোড়াগাড়ি চালক রুস্তম সর্দার বলেন, ‘পদ্মার চরাঞ্চলে সবসময় বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ হয়। এই দিনে আলুর চাষ হয়, তাই এখন বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘাটে আলু এনে পৌঁছে দিচ্ছি। তাতে সারা দিনে আমার এক হাজার টাকার মতন আয় হয়। ঘোড়াকে খাওয়াতে প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা, বাকি যে টাকা থাকে এইটাই আমার উপার্জন।
আরেক ঘোড়ার গাড়িচালক রাজা মিয়া বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চরে সবসময় চলে না, যখন পদ্মা নদীতে পানি কম থাকে গ্রামগুলো নদী থেকে অনেক দূরে সরে যায় তখন এই গাড়ি দিয়ে মানুষসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করা হয়। মে মাসের শেষের দিকে নদীতে পানি চলে আসলে আমাদের ঘোড়ার গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমরা এই দিনের অপেক্ষায় থাকি।
পদ্মার চরের ধনিয়া চাষি ছমেদ মিয়া বলেন, আমি এইবার আট একর জমিতে ধনিয়া চাষ করেছিলাম, এই ধনিয়া চর থেকে ঘাটে আনার জন্য একমাত্র বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়িই পেয়েছি, ঘোড়ার গাড়ি না হলে ধনিয়া ঘাটে নিয়ে আসতে পারতাম না ও বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হতো না।
নারিকেল বাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এই মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি অনেকটা কম থাকার কারণে আমাদের ইউনিয়নের পদ্মার চরগুলো জেগে ওঠে। ফলে চর থেকে মানুষের ঘাটে যাতায়াত করা ও বিভিন্ন জিনিসপত্র বহন করার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠে ঘোড়ার গাড়ি। যে কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কাজেও এই ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হাঁটু পানি থাকলেও অনেক সময় পানি মধ্যে দিয়েও ঘোড়ার গাড়ি চলে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন