খেজুর বা খুরমা মানেই সৌদি আরব তথা মরু অঞ্চলের ফল। মরুভূমিতে এর চাষ ভালো হয়। বাংলাদেশে সৌদি খেজুরের গাছ লাগালেও তেমন ফলন হয় না বললেই চলে। তবে এবার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার রামপাল উপজেলার লবণাক্ত জমিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সৌদি খেজুর চাষ হয়েছে। একইসঙ্গে হয়েছে বাম্পার ফলনও।
বিদেশি এই ফল চাষ করে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছেন মোংলা উপজেলার মল্লিকের বেড় ইউনিয়নের সন্ন্যাসী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা দিহিদার জাকির হোসেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলের লবণাক্ত জমিতে সৌদি খেজুরের বাম্পার ফলন কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উপকৃত হবেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। অল্প খরচে খেজুর আবাদ করে স্বাবলম্বী হতে পারবেন যে কেউ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ন্যাসী গ্রামে ১৫ বিঘা জমিতে খেজুরের বাণিজ্যিক বাগান গড়েছেন দিহিদার জাকির হোসেন। বাগানে ৪৫০টি গাছ রয়েছে। সবগুলো সারিবদ্ধ। গাছের থোকায় থোকায় ঝুলছে বিভিন্ন রঙের খেজুর। গত বছর অল্প কিছু গাছে ফল এলেও এ বছর ৮০টিতে ছয় থেকে ১০টি থোকায় খেজুর ধরেছে।
আরও পড়ুন : আমের রাজধানী এখন নওগাঁ
গাছ লাগানোর দুই বছরের মাথায় ফলন পেয়েছেন বলে জানালেন দিহিদার জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় উপজেলা রামপালের লবণাক্ত মাটিতে তেমন কোনো ফসল ভালো হয় না। এই জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি বারবার। পরে রাস্তার পাশে দেশি খেজুর গাছের ফলন দেখে সৌদির খেজুর চাষের কথা মাথায় আসে। ২০২০ সালে চারা সংগ্রহ করে শুরু করি চাষাবাদ। বাগানে আজওয়া, মরিয়ম, সুকারি, আম্বার ও বারহি জাতের ৪৫০টি গাছ আছে। গত বছর কিছু গাছে ফল এসেছিল, এবার ৮০টিতে ফল এসেছে। কোনো কোনো গাছে প্রচুর ফল ধরেছে। এতটা আশা করিনি।
এই এলাকায় চিংড়ি ছাড়া অন্য ফসল তেমন হয় না উল্লেখ করে এই চাষি বলেন, ‘খেজুরের বাম্পার ফলন আশার আলো জাগিয়েছে। খেজুর চাষাবাদ এই অঞ্চলের মানুষের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে বাগান গড়ে তুলতে পারলে চিংড়ির মতো রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। স্বাবলম্বী হবেন এই অঞ্চলের অনেকে।’
প্রতিদিন বাগান দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষি উদ্যোক্তারা আসছেন জানিয়ে জাকির হোসেন বলেন, ‘যারা আসছেন তাদের সঠিকভাবে বাগান করার পরামর্শ দিচ্ছি। অনেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি পিচ চারা গাছ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করছি।’
বাগানের শ্রমিক নাসির বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুনছি মানুষ সৌদি গিয়ে খেজুর বাগানে কাজ করে। সেই খেজুর বাগান দেখার ইচ্ছে ছিল। এখন বাড়ির পাশে খেজুর বাগানে কাজ করে সে ইচ্ছে পূরণ হলো।’
মল্লিকের বেড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তালুকদার নাজমুল কবির ঝিলাম বলেন, সবার কাছে প্রিয় ফল সৌদি খেজুর। রমজান মাসে খেজুর ছাড়া ইফতার যেন অপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, পাকিস্তান ও ভারত থেকেও খেজুর আমদানি হয়। এ বছর সন্ন্যাসী গ্রামের দিহিদার জাকির হোসেনের বাগানে সৌদি খেজুরের বাম্পার ফলন হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের কৃষির জন্য নতুন সম্ভাবনা এটি।
বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লবণাক্ত জমির কারণে রামপাল উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় তেমন কোনো ফসল হয় না। একমাত্র চিংড়ি চাষই ভরসা। কিন্তু গত কয়েক বছর চিংড়ির উৎপাদন ভালো নয়। সন্ন্যাসী গ্রামে ১৫ বিঘা জমিতে দিহিদার জাকির হোসেন নামক এক ব্যক্তি সৌদি খেজুরের বাগান গড়ে তুলেছেন। এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ইতোমধ্যে জেলাব্যাপী খেজুর চাষ ছড়িয়ে দিতে কাজ করছি আমরা।’
লবণাক্ত জমিতে খেজুরের চাষ হলে একদিকে যেমন পতিত জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে খেজুরের উৎপাদন বাড়লে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন