আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহে জিম্মি হওয়া তারেকুলের মা হাসিনা বেগমের কান্না যেন থামছেই না। ছেলের ছবি দেখে বারবার কান্না ডুকরে কেঁদে উঠছেন। সাংবাদিক দেখলেই সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছেন ছেলেকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনার জন্য।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার তারেকুল খুবই নম্র এবং ভদ্র একটি ছেলে। আমার তারেক সাত বছর বয়স থেকে কখনো নামাজ-রোজা কামাই করেনি। সরকার যেনো আমার সন্তানকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে।’
বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) ইফতারের আগে সরেজমিনে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে এমভি আবদুল্লাহে জিম্মি হওয়া তারিকুলের বাড়িতে। ঘরের মধ্যে দাদি, মা এবং বাবা ছাড়া কেউ নেই। স্ত্রী নুসরাত মেয়েকে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে আছেন।
বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীরা। তাদেরও একটিই আকুতি, যেকোনো মূল্যে তারা তাদের প্রিয় তারেকুলকে ফেরত চান।
বেসরকারি কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট মো. তারেকুল ইসলাম। তারেকুল ফরিদপুরের মধুখালি উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ছকড়িকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করে চলে যান ঢাকায়। সেখানে মিরপুরের ড. মো. শহীদুল্লাহ্ কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ২০১২ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে। ২০১৪ সালে নটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরিতে যোগ দেন। সবশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে নতুন করে যোগ দিয়েছিলেন ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়া গোল্ডেন হক নামে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার হিসেবে। পণবন্দি ২৩ নাবিকের মধ্যে ফরিদপুরের সন্তান তারেকুলও এখন পণবন্দি হিসেবে জিম্মি। বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহর থার্ড অফিসার তিনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিয়ে করেন নাটোরের মেয়ে মেডিক্যালের ছাত্রী মোসাম্মৎ তানজিয়াকে। বিবাহিত তারেকুল-তানজিয়া দম্পতির এক বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে।
তারেকুলের বাবা মো. দোলোয়ার হোসেন জানান, গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে ওর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে আমার নম্বরে হঠাৎ করে তিনটা মেসেজ আসে। সাধারণত ও আমাকে মেসেজ দিত না। সব সময় কলই দিত। মেসেজে ও লিখেছে, ‘আব্বু মাফ কইরেন আমাকে, দোয়া করেন আমাদের জন্য।’ এই মেসেজ দেখার পর আমি হকচকিয়ে উঠি। ও হঠাৎ এমন মেসেজ কেন আমাকে দিল। এই ম্যাসেজের উত্তরে আমি লিখি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ, তিনি যেন তোমাদেরকে নেক হায়াত দান করেন। শারীরিকভাবে সুস্থ রাখেন, বেশি বেশি হালাল রুজি উপার্জন করার তৌফিক দেন। এরপর ছেলে কোনো উত্তর না দেওয়ায় আবার লিখি, আব্বু কী অবস্থা তোমাদের? আমাকে জানাও। এরপর বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে এই মেসেজের উত্তরে তারেকুল লেখে, ঠিক আছি, টেনশন কইরেন না, দোয়া করেন।
তারেকুলের দাদি কুলসুম বেগম বলেন, গত কোরবানির ঈদে আমার দাদুভাই বাড়িতে আইছিল। ওর মেয়ের প্রথম জন্মদিনে আমাগো সবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা কইলো। কথা কইলেই আমারে জিগাইতো দাদি তোমার জন্য কী আনব। আমার সভ্য শান্ত নাতিডারে কোন ডাকাতে ধরল। আমি আমার নাতিরে ফেরত চাই।
মন্তব্য করুন