কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে কবি রাধাপদ রায়ের ওপর হামলার ঘটনায় মূল আসামি পলাতক রফিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে শনিবার সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার গোদ্দারেরপাড় এলাকায় কবি রাধাপদ রায়ের ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা বলছেন, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক হামলা বলে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসন বলছে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এই বিচ্ছিন্ন হামলার সূত্রপাত। এটাকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলার কোনো সুযোগ নেই।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
কবি রাধাপদ রায়ের ছেলে জুগল রায় বলেন, আজ থেকে প্রায় সাত মাস আগে তার বড় ভাই মাধব রায় ও নাগেশ্বরী পৌরসভার হাসেমবাজার এলাকার মিলন ঢাকায় একসঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরে মিলন এলাকায় এসে দাবি করেন, তিনি মাধব রায়ের কাছে কাজের টাকা পাবেন এবং এ নিয়ে তিনি এলাকায় সালিশ ডাকেন। সেখানে একসঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করা স্থানীয় শ্রমিকরা উপস্থিত হন। ওই সালিশে হিসাবের খাতায় দেখা যায়, মিলন মাধব রায়ের কাছে ৫০০ টাকা পাবেন। তখনই সেই টাকা ফেরত দেন রাধাপদ রায়।
জুগল রায় আরও বলেন, ওই সালিশে একই উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কচুয়ারপাড় এলাকার কদুর রহমান এসে উপস্থিত হন। তিনি এলাকায় গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণকাজ চলাকালে পূর্বের ৫০০ টাকা নিয়ে সালিশি বৈঠকের ঘটনা উল্লেখ করে রাধাপদ রায়ের স্ত্রীকে তিরস্কার করেন। সে সময় কদুর রহমানের সঙ্গে রাধাপদের বাগবিতণ্ডা হয়, যা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। পরে কদুর রহমানের ছোট ভাই মো. রফিকুল ইসলাম এ ঘটনার প্রতিশোধ নেবেন বলে হুমকি দেন।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত শনিবার সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার গোদ্দারেরপাড় এলাকায় রাধাপদ রায় হামলার শিকার হন। পাশের এলাকার দুই ভাই মো. রফিকুল ইসলাম ও কদুর আলীর বিরুদ্ধে এ হামলার অভিযোগ ওঠে। কবিকে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ফেটে রক্তাক্ত হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। এ ঘটনায় কবি রাধাপদ রায়ের ছেলে জুগল রায় গত রোববার রাতে অভিযুক্ত দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে নাগেশ্বরী থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার অগ্রগতি কতটুকু
তবে ঘটনার চার দিন পর অভিযুক্ত দুই ভাইয়ের মধ্যে মূল আসামি পলাতক রফিকুলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অপর ভাই কদুর এখনো পলাতক।
কবির ছেলে জুগল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভিতরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান শফিউল আলমের মদদপুষ্ট হয়ে রফিকুল ও কদুর আলী আমার বাবার ওপর হামলা চালায়।
এ ব্যাপারে নাগেশ্বরী থানার ওসি মো. আশিকুর রহমান বলেন, কবিকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি এখন সুস্থ আছেন।
বর্তমানে কেমন আছেন কবি
নাগেশ্বরী উলজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কবির শারীরে দেশীয় অস্ত্র দ্বারা আঘাতের জখম রয়েছে। তার সারা গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। বলা যায়, আগের চেয়ে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আমরা কবির পরিবারকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
কবির ওপর হামলা নিয়ে কে কী ভাবছেন
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোরশেদুল ইসলাম বলেন, কমিউনালিজম বা সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে এক ধরনের মনোভাব। কোনো ব্যক্তির মনোভাবকে তখনই সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা দেওয়া যায়, যখন সে এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্তির ভিত্তিতে অন্য এক ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচারণ ও ক্ষতি সাধন করতে প্রস্তুত থাকে। নাগেশ্বরীতে কবি রাধাপদ রায়ের ওপর যে হামলা হয়েছে এটা সাম্প্রদায়িক হামলার মধ্যে পড়ে না, ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্রোশ থেকেই এটা হয়েছে।
বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট নাহিদ হাসান নলেজ বলেন, ঘটনার শুরু ৫০০ টাকা লেনদেন নিয়ে। যাদের মধ্যে টাকা ধার দেওয়া, বাকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে, সেখানেও সাম্প্রদায়িকতা খুঁজছেন আপনারা। আক্রমণকারী ছেলেটিকে রাধাপদ রায় কাকা থামাতে গিয়েছিলেন, বেয়াদব বলে শাসনও করেছেন। শাসন করার অধিকার আমরা মুরুব্বিদের দিয়ে রেখেছি, তিনি মুসলিম না হিন্দু এই ভেদ এখানে নেই।
স্থানীয় সংবাদকর্মী কল্লোল রায় বলেন, নাগেশ্বরীতে কবি রাধাপদ রায়ের ওপর হামলার ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয়। পূর্বশত্রুতার জেরে একটি হামলা। বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে দাবি করে প্রচার না করার অনুরোধ জানাই। সংখ্যালঘু বলে আমরা ৮০ বছরের সম্মানিত ভুক্তভোগীকে আগেই দুর্বল না করি। তিনি দেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে বিচার পাওয়ার দাবি জানাই।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম কালবেলার জেলা প্রতিনিধিকে বলেন, এটি নিতান্তই ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এখানে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, আমি নিজেই কবি রাধাপদ রায়কে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছি, তার চিকিৎসার খবরাখবর নিয়েছি। তিনি বতর্মানে অনেকটা সুস্থ আছেন, ঘটনা যাই ঘটুক তিনি হামলায় আহত হয়েছেন। মূল আসামি রফিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর আসামি গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য করুন