নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার পৌর শহরের কংশ নদের পাড়ে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে নির্মাণ করা হয় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। ২০ টন মাছ মজুদ এবং প্রতিদিন ২০ টন বরফ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গত ২২ মার্চ হতে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয় না কোনো মাছ, উৎপাদন হয় না বরফও।
গত দুই বছরে প্রায় ২৭ লাখ টাকার বরফ বিক্রি হলেও তা এ বছর নেমে এসেছে শূন্যে। প্রতি মাসেই বরফকলটি পরিচালনায় এবং স্টাফদের বেতন বাবদ ব্যয় হয় প্রায় তিন লাখ টাকা, যা ব্যয়ের হিসাবে পাঁচ মাসে হয় ১৫ লাখ টাকা কিন্তু গত পাঁচ মাসে আয় হয়নি এক টাকাও। কোল্ড স্টোরেজ, মেশিন রুম, বরফকল, সাবস্টেশন ও জেনারেটর রুমসহ সব কক্ষে ঝুলছে তালা।
কোল্ড স্টোরেজে মাছ মজুদ থাকার কথা থাকলেও সেখানে থাকেন ওই কেন্দ্রে এমএলএসএস পদে কর্মরত মো. রুবেল রানা নামের এক ব্যক্তি। কাগজে কলমে ১০ জন স্টাফ কর্মরত থাকলেও অফিসে গিয়ে একজন ছাড়া পাওয়া যায়নি অন্যদের।
ভাটি বাংলার রাজধানী হিসেবে খ্যাত মোহনগঞ্জ সারা দেশে মাছের জন্য বিখ্যাত। জমজমাট ছিল মাছের বাজার। সেই মৎস্য ব্যবসা বরফ সংকটে হুমকির মুখে। বরফ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্টাফরা দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের গাফিলতি এবং তদারকির অভাবে মৎস্যজীবীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক স্টাফেই নিয়মিত আসেন না অফিসে। তাদের গাফিলতি এবং ঢিলেমিতে বরফ উৎপাদন বন্ধ। মাছ নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বলছে।
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সামনে এবং ভিতরে প্রতিদিন ৫০ টাকা রশিদের বিনিময়ে ভাসমান প্রায় শতাধিক দোকানপাট বসে। দায়িত্বরত অ্যাকাউন্টসের মাধ্যমে জানা যায়, প্রতিদিন কালেকশন হয় ১২শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা মাত্র। ২০১৮ সালে ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি।
সরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে না চাইলেও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন মোহনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শরিফুল ইসলাম কালবেলাকে জানান, মার্চের দিকে প্রায় দেড় টন মাছ মজুদ ছিল কিন্তু মেশিন নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা তাদের মাছ বের করে নিয়ে যায়। তারপর আর কোনো মাছ সংরক্ষণ করা হয়নি। ২২-২৩ অর্থ বছরে ১৫ লাখ টাকা এবং এর আগের বছর ১২ লাখ টাকা, মোট গত দুই বছরে ২৭ লাখ টাকার বরফ বিক্রি করলেও এই বছর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মেশিন চালু নাই তো, মেশিন পরিচালনাই করা হয়নি তাই আয় শূন্য। স্টাফরা নিয়মিত আসে কিন্তু বরফকল বন্ধ থাকায় স্টাফরা নিজেদের মতো করে আছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিনটা মাসকে পিক ধরা হয়। নভেম্বর ডিসেম্বরের দিকে আস্তে আস্তে মাছ কমে বরফ নেওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই বছর পিক টাইমটা ধরা গেল না, তাই ১০ লাখ টাকা পিছিয়ে গেলাম, টার্গেট ফিলাপ করা যায়নি।
কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ দেখালেও পাঁচ মাসে সেটি মেরামত না করায় বরফকলটি বন্ধ থাকায় সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে মৎস্য ব্যবসায়ীদের পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি।
মালিকানাধীন বরফকলের মালিকদের কাছ থেকে গোপনে সুবিধা নিয়ে দ্রুত সমস্যা সারিয়ে বরফকল চালু না করে, যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে ভরা মৌসুমে বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রটি। এমন অভিযোগ স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের।
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছাব্বির আহমেদ আকুঞ্জি কালবেলাকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে সমস্যা সমাধানের জন্য। আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি আশা করি তারা সমস্যার সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন।
মন্তব্য করুন