আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ১১:০৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

ট্রেন পরিষ্কার করতে বছরে খরচ দেড় কোটি টাকা

রাজশাহীতে অকেজো হয়ে পড়ে আছে ১৯ কোটি টাকার ওয়াশপিট। ছবি : কালবেলা
রাজশাহীতে অকেজো হয়ে পড়ে আছে ১৯ কোটি টাকার ওয়াশপিট। ছবি : কালবেলা

রাজশাহীতে ১৯ কোটি টাকার ওয়াশিং প্ল্যান্টে আর ট্রেন ধোয়া যায় না। উদ্বোধনের কিছুদিন পরই নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ প্রতি বছর বাড়তি প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে ট্রেন পরিষ্কার করতে।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী দুই মেয়াদে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। ওই সময় মূলত তার জেদাজেদিতেই আমেরিকা থেকে যন্ত্রপাতি ‍কিনে রাজশাহীতে এই ওয়াশিং প্ল্যান্টটি বসানো হয়।

ওয়াশিং প্ল্যান্টটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, দক্ষ জনবল নিয়োগ না দিয়েই এটি নামাকাওয়াস্তে চালু করা হয়েছিল। ফলে কিছুদিন সচল ছিল। এখন আবার সেই পুরনো পদ্ধতিতেই ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক দিয়ে হাতে ট্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন ধৌতকরণ প্ল্যান্ট বা ওয়াশপিট উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ট্রেন ধৌতকরণ ব্যবস্থার পর্যাপ্ত সুবিধা ও প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল না থাকলেও ব্যয়বহুল এই প্ল্যান্টটি অনেকটা প্রস্তুতিহীন অবস্থায় চালু করা হয়।

এরপর প্রায় ২০ মাস ওয়াশপিটটি অনেকটা নামকাওয়াস্তে চলেছে। তারপর নানা জটিলতায় ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল এই প্ল্যান্টটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার ম্যানুয়ালি ট্রেনগুলো ধৌতকরণ ও পরিষ্কার করা হচ্ছে ঠিকাদারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং শ্রমিক দিয়ে। এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু অর্থ লোপাটের উদ্দেশ্যে এই ধরনের মেশিন কেনা হয়। যা ব্যবহারের উপযোগিতা বিবেচনা করা হয়নি। ওই সময় রেল মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রামের (রাউজান) সংসদ সদস্য ফজলে কবির চৌধুরীর ব্যক্তিগত আগ্রহে ওয়াশিং প্ল্যান্ট দুটি কেনা হয়েছিল। এরমধ্যে একটি বসানো হয়েছে কমলাপুরে। তবে এই ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে থেকে কোনো চাহিদা দেওয়া হয়নি।

২০২১ সালের ৮ নভেম্বর রাজধানীর কমলাপুর ও রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে একই দিনে ওয়াশপিট দুটি উদ্বোধন করা হয়। দুটি প্ল্যান্ট স্থাপনে ব্যয় হয়েছিল ৩৮ কোটি টাকা। স্থাপনের সময় বলা হয়েছিল, অত্যাধুনিক এই ওয়াশিং প্ল্যান্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনের ছাদ, পার্শ্ব, ভেতর এবং আন্ডারগিয়ার সুচারুভাবে পরিষ্কার করা যাবে। ওয়াশপিটের মাধ্যমে প্রতিটি প্ল্যান্টে প্রতিদিন ১ লাখ লিটার পানি সাশ্রয় হবে ও ব্যবহৃত ৭০ ভাগ পানি রি-সাইকেলের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা যাবে।

বিদ্যুৎচালিত এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে মাত্র ১০ মিনিটে ১৪ কোচের একটি ট্রেন ধৌত ও পরিষ্কার করার কথা ছিল। পানিতে শুধু জীবাণুনাশক ও ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা হবে। সেভাবেই সীমিতভাবে ওয়াশিং প্ল্যান্টে ট্রেন ধৌতকরণের কাজ হয়েছে ২০ মাস। এই প্ল্যান্টে আগে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে দিনে মোট ১১টি ট্রেন ধৌতকরণ ও পরিষ্কারের কথা বলা হলেও সেখানে দিনে ৮টি ট্রেন পরিষ্কারের কাজ করা হতো। এর বড় কারণ ছিল জনবলের ঘাটতি।

রাজশাহীর ওয়াশপিটের দায়িত্বে আছেন টিএক্সআর বিভাগের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কুরবান আলী। তিনি জানান, ওয়াশপিটটি যখন স্থাপন করা হয়েছিল তখন এখানে ৬২ ভাগ জনবলের ঘাটতি ছিল। ছিল না প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল। এখনো জনবলের ঘাটতি পূরণ হয়নি। আমরা শ্রমিক দিয়েই ট্রেন ধোয়ার কাজ করছি। একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজটি করা হয়। এতে বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তবে তারা শুধু ট্রেনের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করে। কখনো কখনো আমাদের অনুরোধে বাইরের অংশ পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়।

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, ১৯ কোটি টাকা খরচে বসানো এই ওয়াশিং প্ল্যান্টটি এখন ধুলাবালিতে ঢেকে গেছে। সচল করতে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জানানো হলেও তারা গত এক বছরেও প্ল্যান্টটি পরিদর্শন করেন নি। যদিও এরইমধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তির সময়সীমা পার হয়ে গেছে। ফলে এ প্লান্টটি নিয়ে তেমন আর কারো মাথাব্যথা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এনএস করপোরেশনের তৈরি ট্রেন ওয়াশিং মেশিনগুলো রেলওয়েতে সরবরাহ করে নেক্সট জেনারেশান গ্রাফিকস লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। মেশিনগুলো কেন এত দ্রুত সময়ে অকেজো হয়ে গেল-সেটা নিয়ে রেলওয়েতে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিং প্ল্যান্ট নামে যা ছিল, তা হলো কিছু স্বয়ংক্রিয় ব্রাশ, সাবানপানি ও সাধারণ পানি ছিটানোর ব্যবস্থা এবং কয়েকটি বৈদ্যুতিক পাখা ছিল। সাধারণ এই ব্যবস্থা তৈরিতে এত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল তখনই। অনেক দিন ধরে প্ল্যান্টটি বন্ধ। সেটি পুনরায় চালু করতে আরও বিনিয়োগ দরকার, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। ওই সময় রেলের কিছু কর্মকর্তা এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আগ্রহে এই ওয়াশপিট দুটি আমেরিকা থেকে কেনা হয়েছিল।

এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (সিএমই) মো. সাদেকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বন্ধ হওয়ার আগে আগে রাজশাহীর মেশিনটি ঠিকমতো সার্ভিস দিচ্ছিল না বলে জেনেছি। যেহেতু এসব মেশিন কোচ ক্রয় প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছিল সে কারণে প্রকল্প পরিচালক এই বিষয়ে ভালো জানেন। তবে শুনেছি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াশিং প্ল্যান্ট দুটি পুনরায় চালুর জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দের জন্য ঢাকায় রেল ভবনে প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এখন সেটা কবে নাগাদ অনুমোদন হয়ে আবার প্ল্যান্ট চালু হবে তা বলা যাচ্ছে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ রপ্তানিতে তেমন প্রভাব ফেলবে না : অর্থ উপদেষ্টা

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ / ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভয়াবহ গড়িমসি করছে  

কক্সবাজারে জমি নিয়ে সংঘর্ষ, জামায়াত নেতাসহ নিহত ৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদে, আহত ২৫

গাছে ঝুলছিল মা-ছেলের মরদেহ

হবিগঞ্জে দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত ৫০

বাংলাদেশে চাইনিজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার

ভারতে ওয়াকফ আইনের বিরোধিতা করে আসিফ নজরুলের স্ট্যাটাস 

ভয়ংকর যুদ্ধের পরিকল্পনা করছেন পুতিন, গোয়েন্দা রিপোর্ট

এরদোয়ানের দলে যোগ দিলেন বিশ্বকাপজয়ী তারকা ওজিল

১০

প্রতিপক্ষ কোচের নাক চেপে ধরে তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ মরিনহো

১১

‘বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মজবুত অবস্থান তৈরি করেছিলেন আরাফাত রহমান’

১২

২৪ ঘণ্টায় যমুনা সেতুতে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার টোল আদায়

১৩

দীর্ঘ ছুটি শেষে বুধবার খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

১৪

ইভ্যালির রাসেল-শামীমার তিন বছরের কারাদণ্ড 

১৫

ছয় ম্যাচ হাতে রেখেই ফরাসি লিগের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন পিএসজি

১৬

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চায় বাংলাদেশ

১৭

পেনাল্টির বাজিতে হেরে ভ্যালেন্সিয়ার গোলকিপারকে টাকা দেননি ভিনি!

১৮

মদ্যপ অবস্থায় থানায় ঢুকে পুলিশকে হত্যার হুমকি, অতঃপর...

১৯

হজ মৌসুমে কেন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয় সৌদি

২০
X