চট্টগ্রামের দ্বীপবেষ্টিত উপজেলা সন্দ্বীপের মানুষ স্বস্তিতে নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বেশকিছু গ্রুপ-উপগ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের নানারকম অন্যায়-অপকর্মে এলাকাবাসী আতঙ্কিত। এসব গ্রুপের নেতাদের ছত্রছায়ায় দেদার চলছে মাদক ব্যবসা, অবৈধভাবে মাটি কাটা, দখল বাণিজ্যসহ নানা অপকর্ম। আর এসব অনিয়ম স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের পদধারী নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছেন অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা বলছেন, যুবদল যেন যুবলীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
সর্বশেষ গত বুধবার (০২ এপ্রিল) সন্দ্বীপের মগধরা ইউনিয়নের পোলিশ্যা বাজারে প্রভাব বিস্তার করা নিয়ে বিএনপি ও যুবদলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। কয়েক দিন আগে কাছিয়াপাড় বেড়িবাঁধ এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। এসব বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, সন্দ্বীপ একটি প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার বেশিরভাগ পুরুষ প্রবাসে (রেমিট্যান্স যোদ্ধা) থাকায় পুরুষবিহীন পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেননা, গত প্রায় ৮ মাসে চট্টগ্রাম জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। সন্দ্বীপে অতিসম্প্রতি বেশ কয়েকটি ডাকাতি, সিঁধেল চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, চুরি, আত্মহত্যা, প্রভাব বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, জায়গা-জমি সংক্রান্ত মারামারির ঘটনা ঘটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বেড়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয় মসজিদ, মন্দিরের সোলার ব্যাটারি চুরির ঘটনাও ঘটছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ এবং ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দলীয় অবস্থান প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার শুক্রবার (০৪ এপ্রিল) কালবেলাকে বলেন, আমাদের কাছে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্দ্বীপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না দেখে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন সন্দ্বীপ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের সদস্য সামছু উদ্দীন সামছু। তিনি বলেন, সন্দ্বীপের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হয়ে সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের মতো অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সন্দ্বীপে শান্তি ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি।
জানা যায়, গত প্রায় চার মাসের বেশি সময় ধরে সন্দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই নাজুক। গত ১৫ জানুয়ারি সন্দ্বীপ উপজেলার হারামিয়া ইউনিয়নের বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মাইন উদ্দিন ফয়সলকে গুলি করার ঘটনা এবং মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে গত ২০ জানুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে গাছুয়া ইউনিয়নের বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনায় সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গত ৮ মার্চ বাউরিয়া ইউনিয়নের হাদী গ্রামে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ধারালো ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হন বিএনপি কর্মী মাকসুদ, কামরুল, শিহাব, মাসুদসহ অনেকেই। আহতদের অভিযোগ- হামলার নেতৃত্বে ছিলেন আবির, নাদিম, ইমাম, সোহেল, ফাহাদ, সাজিদ। যাদের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ভিকটিমদের হত্যাচেষ্টার পরও পুলিশ মামলা নিতে টালবাহানা করে। এ ঘটনায় মামলা না নিতে পুলিশকে চাপ সৃষ্টি করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক আশ্রাফ উল্লাহ। পরে মামলা হলেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি সন্দ্বীপ থানা পুলিশ। এর আগে ২ মার্চ সন্দ্বীপের সারিকাইত দুর্গাচরণ ঘাট দখল নিয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে গুলিবর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মাদকের প্রতিবাদ করায় ছাত্রদল নেতা নিলয় ও রোবেলের উপর হামলা করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ধোপারহাটে বিএনপি নেতা কাশেম মেম্বারের উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে।
এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় গরু চুরি, মহিষ চুরি এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে বেপরোয়া চাঁদাবাজির ঘটনা এক প্রকার অসহনীয় পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। উপজেলা যুবদলের শীর্ষ নেতার অনুসারী তসলিম, টিটু হায়দার, কামরুল বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে অভিযোগ। অন্যদিকে সামাজিক অস্থিরতা ও পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়েছে। গত দুই মাসে তিনজনের আত্মহত্যা এবং বেশ কয়েকটি ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বরর ওয়ার্ডে শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে, সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব এমএ আজিজ বলেন, এসব নিরসনের চেষ্টা চলছে। যুবদলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা মিথ্যা এবং অসত্য।
গত ২০ আগস্ট সারিকাইতে কৃষ্ণ জলদাসের ১০ লাখ টাকার মাছ ধরার জাল লুট করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। ২৫ সেপ্টেম্বর মগধরা ছোঁয়াখালী বেড়িবাঁধে মহিলাকে মারধর করে সন্ত্রাসীরা। বেড়িবাঁধের বাহিরে সরকারি খাস জায়গা থেকে দেদার মাটি কাটছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এসব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা শুক্রবার (০৪ এপ্রিল) কালবেলাকে বলেন, ৫ আগস্টের পর একটি বিশাল পটপরিবর্তন। সারা দেশে যেমন অবস্থা এখানেও তেমন। তারপরও সন্দ্বীপে অনেকাংশে আইনশৃঙ্খলা ঠিক ছিল। কিন্তু ইদানীং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে দখলদারিত্ব এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন বিষয় বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদের সময় সবাই বাড়ি-ঘরে থাকে এবং এ সময় ঝামেলা হয়। ফলে অতিসম্প্রতি এরকম অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে। তিনি বলেন, কে কোথায় কখন কী করে বসে সেটা তো আমরা বলতে পারব না। ‘সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী অফিসার আওয়ামী লীগের লোকদের সুবিধা দিচ্ছে’ এই অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও রিগ্যান চাকমা বলেন, এই অভিযোগ কে করেছে? আপনি যেহেতু পত্রিকায় আছেন বিষয়টি খুঁজে বের করুন।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম সফিকুল আলম চৌধুরীকে ফোন ও ম্যাসেজ দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
মন্তব্য করুন