কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দেশের পর্যটন রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত ব্যস্ততম সড়কটিতে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছে ও পঙ্গুত্ববরণ করছে পর্যটক এবং সাধারণ নাগরিক। ঈদযাত্রায় বিগত চার দিনে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৮টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে।
চুনতির জাঙ্গালিয়া ট্রাজেডির রেশ না কাটতেই ৩ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের ব্যস্ততম ডলফিন মোড়ে ব্রেক ফেল করা তিশা পরিবহনের বাসচাপায় পর্যটকসহ ৫ জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে গেছে সিএনজি ও অটোরিকশা। এদিন সকালে মালুমঘাট রিংভং, চকরিয়া ও নাপিতখালীতে পৃথক দুর্ঘটনায় পর্যটকবাহী বাস উল্টে অন্তত ৪০ জন কমবেশি আহত হয়েছে। চকরিয়ার পার্শ্ববর্তী পর্যটন স্পট লামার মিরিঞ্জার কাছে বাস উল্টে শিশুসহ ২৫ জন গুরুতর আহত হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে।
এর আগে ঈদযাত্রায় গত তিন দিনে চট্টগ্রাম মহাসড়কের লোহাগাড়া জাঙ্গালিয়া ঢালা নামক স্থানে দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ১৫ জন নিহত হয়েছে। পৃথক ঘটনায় অন্তত আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। টানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার ঘটনায় কক্সবাজার চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নতি করণের দাবি জোরালো হচ্ছে। মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে জনদাবি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ সভা- সমাবেশ করছে।
বৃহস্পতিবার চার লেনের সড়কের দাবিতে লোহাগাড়ায় মানববন্ধন করেছে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)র নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রুকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা'র অর্থায়নে ১৪৮ কিলোমিটার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরে এ কাজ শেষ হলে প্রকল্প প্রস্তুত করে দরপত্র আহবান করা হবে। তার মতে, আগামী ২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চার লেন সড়ক উন্নতির কাজ শুরু হতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কের একটি। এর বেশির ভাগ অংশের প্রশস্ততা মাত্র ১৮-৩৪ ফুট। ফলে দূরপাল্লার গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ১৪৮ কিলোমিটার পথ বাসে যেতে সময় লাগে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। অতিরিক্ত বাঁক, উপসড়ক থেকে যত্রতত্র ছোট বড় গাড়ি মহাসড়কে উঠে আসার কারণে সড়কটি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রবণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পলিথিন বিহীন ট্রাক ভর্তি লবণ পরিবহন। যেটি সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলায় উৎপাদিত লবণ। যার কারণে রাতের কুয়াশার সাথে লবণ পানি একাকার হয়ে সড়কটি মারাত্মক পিচ্ছিল করে তুলছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ১৫৮ কিমি দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক।
এদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটির অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কের হাশমতের দোকান, ঠাকুরদীঘি, উপজেলার পদুয়া, লোহাগাড়া শহর, আধুনগর, হাজি রাস্তা, চুনতি, জাঙ্গালিয়া এলাকা, চকরিয়া অংশের ইসলাম নগর ইমাম বুখারী মাদ্রাসা এলাকা, বানিয়ারছড়া ওরি আমগাছ তলা, হারবাং লালব্রীজ এলাকা আজিজ নগর, চকরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এলাকা, লক্ষ্যারচর জিদ্দা বাজার টার্নিং পয়েন্ট, মালুমঘাটের রিংভং ছগিরশাহকাটা ঢালা, ডুলাহাজারার পাগলিরবিল, খুটাখালী জাতীয় উদ্যান, নাপিত খালী, রামু রাবার বাগান, ঝিলংজার পূর্ব খরুলিয়া, মুক্তারকুল ও কক্সবাজার শহরের প্রবেশদ্বার খ্যাত ডলফিন মোড়।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উত্তর অংশের সড়ক দুর্ঘটনা প্রবণ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। পাশাপাশি চকরিয়ার গাড়ির আকারের তুলনায় সড়কটি খুবই সরু, দুটি স্লিপার কোচ পার হতে গেলে একটি রিকশা চলারও সুযোগ নেই। শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ট্রাকে কিংবা কাভার্ডভ্যানে লবণ পরিবহন হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ট্রাক থেকে নির্গত লবণ পানিতে পিচ্ছিল হয়ে যায় সড়ক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাইকার এবং পিকনিকের বাস এ সড়কের চরিত্র বুঝতে পারে না। অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারান চালক। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় ঝরে যায় তাজা প্রাণ। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি থেকে বাঁচতে এবং বাঁচাতে নিরাপদ সড়ক কিংবা চার লেনের সড়কের দাবি জানান কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো সার্কেল-২ এর মোটরযান পরিদর্শক মো. রেজোয়ান শাহ বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরু এ সড়কে আছে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক বাঁক। সড়কটি চার লেন করা হলে দুর্ঘটনা কমে যেত। বুধবার সড়ক দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ওই সময় ৬টি কারন চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মতে, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, দুই পাশে ঘন বনাঞ্চল, লবণবাহী ট্রাক থেকে নিঃসৃত পানি, অপ্রশস্ত সড়ক, জাঙ্গালিয়ার সড়ক ঢালু এবং দূরপাল্লার গাড়িচালকদের অভিজ্ঞতা নেই এ সড়কে যান চলাচলে।
লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের টিম লিডার রাখাল চন্দ্র রুদ্র জানান, ঈদের ছুটিতে তিন দিনে মহাসড়কের এ অংশে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার জন্য আমরা বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছি। লবণপানি সড়কে পড়ে পিচ্ছিল হওয়া, বিপজ্জনক বাঁক, অন্য জেলার চালকদের এ সড়কে গাড়ি চালনোর অভিজ্ঞতা না থাকা অন্যতম কারণ।
এদিকে চট্টগ্রাম কক্সবাজার ৬ লাইনের সড়কের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে লোহাগাড়া বিএনপির নেতারা। এ সময় তারা পর্যটনের শহর কক্সবাজার ৬ লাইনের পাশাপাশি মাঝখানে ডিভাইড এবং ওয়ান ভাই রাস্তা নির্মাণের দাবি জানান।
এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, চালক স্পিডে গাড়ি চালালে মামলা দিতে নির্দেশনা আছে। বৃহস্পতিবার নির্দেশ অমান্য করে গাড়ি চালানোয় ৭ টি মামলা দিয়েছি। তাছাড়া লবণ পরিবহনের সময় নির্গত পানি গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি পিচ্ছিল করে তুলছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
মন্তব্য করুন