সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:০৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

৩ দিনেও সম্ভব হয়নি বেড়িবাঁধ সংস্কার

সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি : কালবেলা
সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি : কালবেলা

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় নদীর ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ তিনদিনেও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে হাজার হাজার বিঘা মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত হয়েছে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি।

এখন পর্যন্ত আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট, বল্লভপুর, আনুলিয়া, নয়াখালী, চেঁচুয়া, কাকবসিয়া, পারবিছুট ও বাসুদেবপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া আংশিক প্লাবিত গ্রামের সংখ্যা কমপক্ষে ৮টি। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন ১৫ হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে ২০০ বিঘা জমির ধান, ৪ হাজার বিঘার অধিক চিংড়ি ঘেরসহ প্রায় ৮ শতাধিক বসতবাড়ি।

এর আগে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন সোমবার (৩১ মার্চ) পৌনে ৯টার দিকে সাতক্ষীরা বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ থেকে খোলপেটুয়া নদীর ২০০ ফুট এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ হঠাৎ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয় গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে টানা তিনদিন ভাঙন পয়েন্টে বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বাঁধ ভেঙে প্রবল জোয়ারের পানি গ্রামগুলোর ২০০ বিঘা জমির ধান ও ৪ হাজার বিঘার অধিক চিংড়ি ঘের তলিয়ে দিয়েছে। প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ এখন দূর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভাঙনের পরপরই গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিকল্প রিং বাঁধ তৈরির চেষ্টা করলেও, প্রবল জোয়ারের তোড়ে সেই বাঁধও ধসে পড়ে। ফলে নতুন করে আরও বেশি এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছের ঘেরে নদীর লবণ পানি প্রবাহের জন্য বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে তলা দিয়ে পাইপ বসানোর কারণে বাঁধের নিচের মাটি দুর্বল হয়েছিল। যে কারণে আস্তে অস্তে তলার মাটি ক্ষয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে বেড়িবাঁধ ধসে পড়ে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে বিছট গ্রামের ভাঙন পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে বেড়িবাঁধের ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে প্লাবিত এলাকার পানি নামছে খোলপেটুয়া নদীতে। পানির স্রোতের সঙ্গে ভাঙছে ল্যান্ড সাইডের ভূমি। স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকশ মানুষ ভাঙন পয়েন্ট থেকে বেশ কিছু দূরে মাটি ও বালির বস্তা দিয়ে রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তবে দুপুরে জোয়ার শুরু হলে ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে ফের প্রবল বেগে পানি ঢোকা শুরু করে লোকালয়ে। ফলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভয়ে বিছট গ্রামের অনেকে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। মাটির ঘর ভেঙে পড়া আশঙ্কা অনেকে মালপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিছট গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও পাউবো কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে ভাঙন মেরামতের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। কীভাবে কাজ শুরু করলে দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করে একটি বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণ করা যাবে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির ফলে বিড়ম্বনা দির্ঘায়িত হচ্ছে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের।

বিছট নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু দাউদ জানান, বিছট গ্রামের যে স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, ওই স্থানটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। এ ছাড়া মূল যে পয়েন্টটি ভেঙেছে সেখানে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। মাছের ঘেরে পানি তোলার জন্য পাউবোর বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসিয়ে পানি তোলার কারণে হঠাৎ বাঁধটি ধসে যায়।

আনুলিয়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. রুহুল কদ্দুস জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নির্ঘুম রাত কাটছে। ঈদে ইউনিয়নের মানুষ আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। ইতোমধ্যে বিছট, বল্লভপুর, আনুলিয়া, চেঁচুয়া, কাকবাসিয়া গ্রামের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে নয়াখালী গ্রাম। এসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে। বোরো ধানের খেত তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে কাঁচা ঘর ভেঙে পড়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) সকালে জেলা প্রশাসক, ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত আশাশুনি আর্মি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেন।

বর্তমানে আশাশুনি ক্যাম্প থেকে দুটি প্যাট্রল টিম দুর্গত এলাকায় অবস্থান করে স্থানীয় লোকজন এবং প্রশাসনকে বাঁধ মেরামতের কাজে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে। এ ছাড়াও, ৫৫ পদাতিক ডিভিশন থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়নের একটি দলকে বাঁধ মেরামতের জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, ভাঙন কবলিত এলাকার ৩০০ মিটার এলাকাজুড়ে রিং বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। জোয়ারের কারণে কাজে কিছুটা সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। নদীতে ভাটা শুরু না হলে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার কাজ করা গেলে একটা পর্যায়ে আসবে বলে জানান তিনি।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ঈদের কারণে শ্রমিক সংকট ও বালু বোর্ড আনতে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। জোয়ারের পানির কারণে বুধবার সকাল থেকে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বুধবার সন্ধ্যা থেকে সারারাত কাজ চলবে। আশা করি বৃহস্পতিবারের মধ্যে কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া আক্রান্ত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করা হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাত-পা বেঁধে নির্যাতন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে সাংবাদিক

আরও ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য আইএমএফের চাপ

যশোরের সেই ফুচকা বিক্রেতা আটক

আন্দোলনে নিহত তাহমিদের পরিবারের পাশে ছাত্রদল

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

ইতালির নাগরিকত্ব নীতিতে পরিবর্তন, নতুন আইনের সমালোচনা

মস্কোতে ‘মাস্তুল’

এবার ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পের আঘাত

এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাল শিক্ষা বোর্ড

ভারত থেকে ফিরে সন্ত্রাসী অলি গ্রেপ্তার

১০

বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘতম উপকূলরেখা নিজেদের দাবি ভারতের

১১

নোয়াখালীতে জমজ বোনকে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১

১২

নিজ দেশের নাগরিককে গুলি করে মারল বিএসএফ

১৩

কারাবন্দিদের জন্য ঈদে ব্যতিক্রমী আয়োজন, স্বজনদের ফুল দিয়ে বরণ

১৪

পরিবর্তন আনতে চাইলে পদ্ধতি বদলাতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা

১৫

বাসভর্তি পর্যটক নিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা, অতঃপর...

১৬

কৃষকের হাত-পা বেঁধে ১১ গরু লুটে নিল ডাকাতদল

১৭

ভারতীয় মিডিয়া মিথ্যা বলায় চ্যাম্পিয়ন : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

১৮

এই সরকার ব্যর্থ হলে শহীদের রক্ত বৃথা যাবে : টুকু

১৯

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের উন্নতি

২০
X