শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু তুলে বৈধ নিলামের কাগজ দিয়ে অবৈধ বালু বিক্রির মহোৎসব চলছে। গত ১২ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়ে জব্দকৃত বালুর স্তূপ সরানোর কথা থাকলেও উল্টো বাড়ানো হয়েছে সময়।
অভিযোগ উঠেছে, অপসারণে অযাচিত সময় বৃদ্ধির মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলনের এই সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছেন খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের। আবার জেলা প্রশাসন বলছে, অবৈধ বালুর সঙ্গে যারাই সম্পৃক্ত থাকবে, কোনো ছাড় নয়।
জানা যায়, শ্রীবরদী উপজেলার কোনো নদীতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালু মহালের ইজারা দেওয়া হয়নি। তাই এ উপজেলার নদীগুলো থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সীমান্তবর্তী বালিজুড়ী, খাড়ামোড়া ও রাঙ্গাজান পাহাড়ি গ্রামের সোমেশ্বরী নদীতে যত্রতত্র ৩০-৩৫টি ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ইউএনও শেখ জাবের আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বালিজুড়ী বাজার সংলগ্ন বালিজুরী-ভায়াডাঙ্গা রোড, বালিজুরী-কামালপুর রোড ও বালিজুরী হাইস্কুল রোড—এ তিনটি স্থানে পাহাড় ও নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু জব্দ করা হয়। পরে গত ২ মার্চ উপজেলা পরিষদের হলরুমে জব্দকৃত ওই বালুর নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫০ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রহিম দুলাল। গত ৫ মার্চ তাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
কার্যাদেশে ১২ মার্চের মধ্যে বালু অপসারণ করতে বলা হয়। না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বালু জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পর দুলাল এসব বালু তৃতীয় পক্ষ যুবদল নেতা আবু রায়হান মো. আল বেরুনীসহ কয়েকজনের কাছে ২৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন।
এদিকে ৯ মার্চ শ্রমিক সংকট ও পানির স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে আরও ১০ দিনের সময় পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ মার্চ পর্যন্ত বালু অপসারণের সময় বৃদ্ধি করেন ইউএনও। অন্যদিকে ১০ মার্চ মূল নিলাম গ্রহীতা বালু অপসারণ করা হয়ে গেছে বলে জানিয়ে সময় বৃদ্ধি না করতে আরেকটি লিখিত আবেদন করেন।
সরেজমিন দেখা যায়, বালিজুরী-কামালপুর রোড ও বালিজুরী হাই স্কুল রোডে বালুর বিশাল স্তূপ। স্থানীয় কয়েকজন জানান, এগুলোই জব্দকৃত ও নিলামে বিক্রির বালু। এগুলো বিক্রি না করে আবারও অবৈধভাবে নিলামের বৈধ স্লিপ ব্যবহার করে প্রতিদিন ৪০-৫০ ট্রাক বালু বিক্রি করা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সীমান্তবর্তী বালিজুড়ী, রাঙাজান ও খাড়ামোড়া এলাকার সোমেশ্বরী নদীর আশপাশের এলাকা। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই এলাকাগুলোতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ব্যারিস্টার শাহাদাত হোসেন বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগে হুমকির মুখে পড়েছে সীমান্তবর্তী বালিজুড়ী, রাঙাজান ও খাড়ামোড়া এলাকার সোমেশ্বরী নদীর আশপাশের এলাকা। কয়েকদিনের মধ্যে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে গণআন্দোলন করা হবে। আগামী ২০ তারিখের পরে উচ্চ আদালতে বিষয়টি সুরাহা চেয়ে আমি নিজে রিট পিটিশন দায়ের করব।
ঘটনার ব্যাপারে নিলাম গ্রহীতা আব্দুর রহিম দুলাল বলেন, সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও আইনগত জটিলতা হবে মনে করে আবার সময় বৃদ্ধি না করার আবেদন দিই। বর্ধিত সময় আজ (গতকাল) শেষ হয়েছে। এর পরও বালু অপসারণ না হলে আমি ইউএনওর সঙ্গে কথা বলব আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও শেখ জাবের কালবেলাকে বলেন, নিলাম গ্রহীতার ১০ দিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে ৭ দিনের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। তবে অবৈধ বালু বৈধ কাগজে বিক্রি করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অবস্থাতেই অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি বলেন, অভিযোগ সত্য নয়।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অবৈধ কাজের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, প্রশাসন হোক আর সিভিল হোক, তারা তাদের কর্মফল ভোগ করবে। আর শ্রীবরদীর জব্দকৃত বালুর নিলাম ও অপসারণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি আমি খতিয়ে দেখছি।
মন্তব্য করুন