বৃষ্টিপাত থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাগড়াছড়ির বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি খাগড়াছড়ি জেলার ক্ষতিগ্রস্তরা। কী করবেন তা নিয়ে দিশাহারা।
টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে রাস্তা এবং সেতুর ক্ষতি হয়েছে। কৃষি খাতে ২ হাজার ১২৪ হেক্টর ফসলি জমির আমন, আউশ ও শাক-সবজি নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম রবিশস্য চাষে প্রণোদনা দেওয়ার কথা জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
এদিকে চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী নদীর পানি কমায় খাগড়াছড়ি জেলা সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড় ও মহালছড়িতে নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ছাড়া অন্যান্য জায়গা থেকে পানি নেমে গেছে। পানি নামার পরও জেলার দীঘিনালা ও রামগড় উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে ।
চলতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দীঘিনালা। মাইনী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠায় এটি মাইনী ভ্যালি হিসেবে পরিচিত উপজেলার মেরুং ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নটি ৫-৬ দিন ধরে বন্যার পানির নিচে। কিছু কিছু গ্রামে ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও ফসলি জমি থেকে পানি নামেনি। ফলে এখানকার কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেরুং ইউনিয়নে শত শত একর ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
মেরুং ইউনিয়নের পূর্নচন্দ্র কারবারি পাড়ার কৃষক সুমতি রঞ্জন চাকমা জানান, ছয় কানি (প্রতি কানি সমান ৪০ শতক) জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন তিনি। আগস্ট মাসে দুই দফায় বন্যায় ডুবেছে। তবে সবশেষ চারা রোপণ করার কয়েক দিন পর থেকে বন্যা শুরু। গত ২২ আগস্ট ধানের চারা ডুবতে শুরু করেছে, আজ ৫ দিন হয়ে গেল এখনো ধানের জমি পানির নিচে। দুবার জমি নষ্ট হওয়ার পর আর কিছু করার নেই। এখন বন্যার পানি কমলেও নতুন করে চাষ করার মতো সময় নেই। এখন আমরা কী করব?
কৃষকদের মতে, বন্যা ১ থেকে ২ দিন স্থায়ী হলে ধানের চারার তেমন ক্ষতি হতো না। কিন্তু টানা ৪-৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ায় অধিকাংশ ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গেছে।
মেরুংয়ের আরেক কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, দুই কানিতে চাষ করছি। এ মাসে দুই বার ধান রোপণ করলাম। আগস্টের শুরুতে একবার সব নষ্ট হয়ে গেছে। এবার এখনো সব চারা পানির নিচে। মেরুং বাজার থেকে এখনো পুরোপুরি পানি নেমে যায়নি।
বাজারে লাউ আর করলা বিক্রি করতে আসা কৃষক আমিনুল ভূইয়া বলেন, বন্যায় আমার ৪০-৪৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। ধানে গেছে ১৫ হাজার টাকা, বাড়ির পাশের ক্ষেতে বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ করেছি। সেখানে ২০-২৫ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পারতাম। সব বন্যায় গেছে। সবচেয়ে নিচু এলাকায় হওয়ায় মেরুংয়ে বন্যা স্থায়ী হয়েছে।
দীঘিনালার বাবুছড়া, কবাখালি ও বোয়ালখালি ইউনিয়ন থেকে পানি নেমে গেলেও মেরুংয়ের ৩০ গ্রামে এখনো পানি আছে। মেরুং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সমীরণ চাকমা বলেন, বাঁচা মরং এলাকা থেকে হেডম্যান পাড়া পর্যন্ত পুরোটাই ধানি জমি। এ গ্রামে ১৪০ পরিবার আছে সবাই কৃষক। তারা সবাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। হাজাধনমুনি পাড়ায় ধানি জমি, বাকি অর্ধেক সবজি, অনিদ্য কারবারিপাড়া, নেত্রজয় কারবারি পাড়ায় পুরো ধানি জমি। কিন্তু বন্যায় সব শেষ। অনিন্দ্য কারবারি পাড়ায় কয়েকটি পানের বরজ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকদের কোনো সহযোগিতা এখনো আসেনি। সরকারি প্রণোদনা না পেলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
দীঘিনালার উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শাহাদাৎ হোসেন জানান, বন্যায় আমনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ৭৬৫ হেক্টর জমির আমন চারা নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৩২৩ কৃষক। এ ছাড়া ৯০ হেক্টর আউশ এবং ১৩৯ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৮শ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান জানিয়েছেন, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড় ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়লে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় সড়কের দুই দিক থেকে মাটি সরানো হয়েছে।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি-ঢাকা সড়ক যোগাযোগ চালু করা হয়েছে। তবে দীঘিনালা ও সাজেক সড়ক এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। বন্যায় সড়ক যোগাযোগ খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক বন্যায় লক্ষাধিক পরিবার ক্ষমার মুখে পড়েছে জানিয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করা হবে। বন্যায় ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।
মন্তব্য করুন