বাংলাদেশের প্রথম ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার হিজলী গ্রাম। ঢাক ঢোল পিটিয়ে গ্রামটি দেশের প্রথম ‘স্মার্ট ভিলেজ’ বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে সেখানে কিছু সাইনবোর্ড ও হস্তশিল্পের নিদর্শন ছাড়া আর এখন কিছুই নেই। কার্যত গ্রামটি এখন স্মার্ট ভিলেজের নামে ভেঙে যাওয়া মেলার মাঠের মতো।
এই স্মার্ট ভিলেজ গড়ার উদ্যোক্তা ছিলেন ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম ও হরিণাকুন্ডু উপজেলার সাবেক ইউএনও সুস্মতা সাহা। এক বছরের বেশি সময় পূর্বে জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম ও গত বছর ডিসেম্বরে বদলি হন হরিণাকুন্ডু ইউএনও সুস্মতা সাহা। মূলত এই দুজন বদলি হওয়ার পরই ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হিজলী গ্রামটি ভাঙ্গা হাটে পরিণত হয়েছে বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন। যে কারণে দেশের প্রথম স্মার্ট ভিলেজ গড়া তোলা নিয়ে জমকালো প্রচারণায় গ্রামের মানুষ আশায় বুক বাঁধলেও এখন তারা আশাহত ও মর্মাহত।
ইউপি সদস্য আব্দুল হাকিম জানান, আমাদের স্মার্টটা এখন বাইরে চলে যাচ্ছে পড়ে থাকছে শুধু ভিলেজ। তারপরও এখনো আমরা আশাবাদী। সরকারি কর্মকর্তাদের যথাযত পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় স্মার্ট বৈঠকখানাটি খোলা হয় না। বন্ধ রয়েছে লাইব্রেরি ও যুবক্লাব। নারীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং অফলাইন-অনলাইনে বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ করার উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। গ্রামে শক্তিশালী ইন্টারনেট সংযোগ নেই। বাড়ির আঙিনা ও রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত জমিতে আবাদের চিন্তা কার্যত মাঠে মারা গেছে। কৃষি কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, যুব উন্নয়ন অফিসার, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধিরা আগে হিজলী গ্রামে আসলেও এখন তাদের টিকিটাও দেখা মেলে না।
গ্রামবাসী আরিফুল জোয়ার্দ্দার জানান, যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, ঝড়ে পড়া, অটিস্টিক এবং এতিম বাচ্চাসহ সব শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ থেমে গেছে। গ্রামের নামে খোলা ফেসবুক গ্রুপ বহু আগেই নিষ্ক্রিয় হয়েছে। হিজলী গ্রামে সরকারিভাবে কোন ইন্টারনেট সুবিধা নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২৫ বাড়িতে ইন্টারনেট সুবিধা থাকলেও ৩০৯টি বাড়িতে কোন ইন্টারনেট সংযোগ নেই। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের করা স্মার্ট যুব ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ফলে গ্রামের যুব সমাজ আবারো মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সফলতা বলতে গ্রামটি এখনও বাল্যবিয়ে ও আত্মহত্যা মুক্ত রয়েছে।
কাপাশহাটিয়া গ্রামের আতিয়ার রহমান বলেন, হরিণাকুন্ডু ইউএনও অফিসে ইউনুচ, তার ভাই-ভাতিজা দিয়ে স্মার্ট ভিলেজ উন্নয়নের নামে কাপাশহাটিয়া বাওড়ের ধারে মিনি ইকো পার্ক বানিয়ে লুটপাট করছেন। ওই কার্যক্রমে হিজলী গ্রামের কোনো মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এখান থেকে অর্জিত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, হিজলী গ্রামের প্রবেশ পথের রাস্তার দু’ধারে বংশ বিস্তার করেছে ক্ষতিকারক পার্থেনিয়াম গাছ। সেগুলো পরিস্কারের কোন ব্যবস্থা নেই। গ্রামের রাস্তাগুলোর জীর্নদশা। সোলার লাইট ঠিকমতো জ্বলছে না। গ্রামটি অপরাধমুক্ত গ্রামে এমন সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকলেও হানাহানি বন্ধ হয়নি। গ্রামের ইসা, তুহিন, ইমারুল, শহিদুল ও সেলিমসহ অনেককের বরজের পান চুরি হয়েছে। চুরি হয়েছে রেজাউল নামে এক কৃষকের গরু।
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফৎ উদ দৌলা ঝন্টুর বলেন, গ্রামের মানুষের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। সে কারণে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। স্মার্ট ভিলেজ উন্নয়নে ইকো পার্কের জন্য টিআর প্রকল্পের এক লাখ ৭২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। সেই টাকা দিয়ে কি করা হয়েছে জানি না।
ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম বলেন, কাপাশহাটিয়া বাওড়ে পর্যটন কেন্দ্র করতে চেয়েছিলাম, তার বর্তমান পরিস্থিতি প্রেরণাদায়ক। আর স্মার্ট হিজলী গ্রামকে আমরা মডেল করতে চেয়েছিলাম, তা করতে না পারার জন্য ব্যর্থতা যদি থাকে তা আমাদের সবার।
হরিণাকুন্ডু সাবেক ইউএনও সুস্মতা সাহা বলেন, হিজলী গ্রামকে আমরা স্মার্ট ভিলেজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গ্রামের মানুষ সেটা ধরে রাখতে পারিনি। গ্রামের মানুষ কনসেপ্টটা গ্রহন করেনি, হয়তো একদিন হবে।
হরিণাকুন্ডু উপজেলার বর্তমান ইউএনও আক্তার হোসেন বলেন, হিজলি গ্রামের মানুষের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া কৃষি প্রণোদনা নিয়মিত প্রদান করা হচ্ছে এবং অন্যান্য দপ্তরের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। স্মার্ট ভিলেজ গড়তে সর্ব প্রথম ওই গ্রামের মানুষদের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে তা হলে সফলতা আসবে।
মন্তব্য করুন