জেল ছাড়ার আগে ‘নিজেদের’ টিভি বিক্রি করে আসে জঙ্গিরা

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার আসামিদের বুধবার ডান্ডাবেড়ি পারিয়ে আদালতে আনা হয়।
ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার আসামিদের বুধবার ডান্ডাবেড়ি পারিয়ে আদালতে আনা হয়। ছবি : কালবেলা

আদালতে হাজিরা দিতে এসে আর কারাগারে যে ফিরবে না, সেই বিষয়ে নিশ্চিতই ছিল ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গিরা। এজন্য নিজেদের সেলে অবৈধভাবে চালানো একটি টেলিভিশন অন্য বন্দিদের কাছে বিক্রি করে এসেছিল তারা। কাশিমপুর কারাগারে বন্দি থাকলেও তারা অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল ফোনে কথা বলত। এজন্য ওই কারাগারের এক ডেপুটি জেলারকে টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করা হতো। গত রোববার পুরান ঢাকার আদালত এলাকা থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরের দিন তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে ওই জঙ্গিদের সেল থেকে একাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছিনিয়ে নেওয়ার সময় দুই জঙ্গিকে আটক করে রিমান্ডে নিলে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে কারাগারে টেলিভিশন ব্যবহার থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

গত রোববার পুরান ঢাকার আদালত এলাকা থেকে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় মাইনুল হাসান শামীম ওরফে শিফাত ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। এই দুজনই লেখক অভিজিৎ রায় ও প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডের আসামি। গতকাল বুধবার পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ওই সময়ে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে আব্দুস সবুর ও আরাফাত রহমান ওরেফে শামসকে ধরে ফেলে পুলিশ। পরে ওই দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ছিনিয়ে নেওয়া এবং ঘটনার সময়ে আটক চারজনই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের জঙ্গি। জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার সময় সরাসরি অংশ নেওয়া মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফিকে গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিমান্ডে থাকা জঙ্গিরা জানিয়েছে, অনেক আগে থেকেই তারা কারাগারের লোকজনকে ম্যানেজ করে ভেতরে টেলিভিশন নিয়েছিল। নিয়মিতই তারা এই টেলিভিশন দেখত। কিন্তু চলতি মাসের শুরুর দিকেই তারা নিশ্চিত হয়, সহযোগীরা তাদের ‘মুক্ত’ করবে। এজন্য নিজেদের টেলিভিশনটি বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। গত রোববার আদালতে হাজিরা দিতে আসার আগেই সেটি বিক্রি করে দেয় অন্য বন্দিদের কাছে।

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার আসামিদের বুধবার ডান্ডাবেড়ি পারিয়ে আদালতে আনা হয়।
‘শর্ত’ না মানলে ওয়ারিশ সনদ দেন না জাহেদ

সিটিটিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ২০ হাজার টাকায় ওই টেলিভিশনটি জঙ্গিরা বিক্রি করে দিয়ে আসে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। রিমান্ডে পাওয়া তথ্য সত্য হলে কারাগারের ভেতর টেলিভিশন কীভাবে গেল, সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সূত্র জানায়, রোববারের ঘটনার পর সবুর ও আরাফাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, কারাগারে তাদের সেলের ভেতর বিশেষভাবে মোবাইল ফোন লুকিয়ে রয়েছে। এরপর সোমবার পুলিশের একটি দল আকস্মিকভাবে কাশিমপুর কারাগারে যায়। এরপর কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা। রিমান্ডে থাকা একজন জঙ্গি জানিয়েছে, কয়েক দিন আগে বাইরে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় আকস্মিক তল্লাশিতে একজন ডেপুটি জেলারের কাছে সেটি ধরা পড়ে। এরপর ওই জঙ্গি তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে তা মীমাংসা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে ফোনটি জঙ্গির হাতে রেখেই চলে আসে। ওই ডেপুটি জেলারের নামও বলেছে জঙ্গিরা। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তার নাম প্রকাশ করতে চায়নি সূত্রটি।

ছিনিয়ে নেওয়া দুজন এবং ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে আটক দুজনসহ চারজনই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তারা কাশিমপুর কারাগার-২-এ বন্দি ছিল। রোববার ওই কারাগার থেকেই তাদের হাজিরা দিতে আনা হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের কারাগারে টিভি স্থাপন করা এবং মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাশিমপুর কারাগার-২-এর সিনিয়র জেল সুপার মো. আমিরুল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

সিটিটিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার সময় হাতকড়া খুলতে নকল চাবি বাইরে তৈরি করা হয়। তবে চলতি মাসেই তা জেলের ভেতর পৌঁছে দেয় সহযোগীরা। গত ১ নভেম্বর এই জঙ্গিদের একই মামলায় একই আদালতে হাজিরা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওইদিনই কারাগার থেকে নিয়ে আসা ওই জঙ্গিদের হাতে চাবি পৌঁছে দেওয়া হয়। ওইদিনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, পরের হাজিরা তারিখেই তাদের ‘মুক্ত’ করা হবে।

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার আসামিদের বুধবার ডান্ডাবেড়ি পারিয়ে আদালতে আনা হয়।
এসডিজি পূরণে প্রতিশ্রুত সহায়তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

কীভাবে জঙ্গিদের ছিনতাই করা হলো, সেই তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেছেন, ঘটনার দিন আদালতের এজলাস থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়ার সময় জঙ্গি আরাফাত রহমান সিগন্যাল দিতেই সহযোগীরা পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় দুই সহযোগী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিষাক্ত কেমিক্যালের স্প্রে নিক্ষেপ করে মইনুল হাসান ও আবু সিদ্দিক সোহেলের হাতকড়া খুলে ফেলার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ওই দুজনকে ওত পেতে থাকা এক সহযোগী মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে চলে যায়। জঙ্গি সবুর ও আরাফাতও একটি মোটরসাইকেলে উঠে বসে। সেটি চালু দেওয়ার সময়ে জাম্প (লাফিয়ে উঠে) দেওয়ায় তারা তিনজনই ছিটকে পড়ে। তখন চালক জঙ্গি পালিয়ে যেতে পারলেও হাতকড়া থাকায় সবুর ও আরাফাতকে ঝাপ্টে ধরে ফেলে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, মোটরসাইকেলটির গিয়ার প্রস্তুত ছিল। তবে হাতের ক্লাচ না চেপে সেটি চালু দেওয়ায় লাফিয়ে উঠেছিল।

ওই কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের ছিনিয়ে নিতে মোট চারটি মোটরসাইকেল প্রস্তুত থাকলেও সবুর ও আরাফাত ওঠার সময় ছিটকে পড়লে চালক জঙ্গি মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। ওই সময় অন্য দুটি মোটরসাইকেল ফেলেও চালক জঙ্গিরা পালিয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওইদিন আদালত থেকে দুর্ধর্ষ চার জঙ্গিকে একসঙ্গে এজলাস থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়া হয়। তাদের কেন একসঙ্গে নেওয়া হলো, এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তায় থাকা পুলিশের কেউ কোনো কারণে প্রভাবিত হয়ে বা পরিকল্পিতভাবে ওই কাজ করেছে কিনা, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার আসামিদের বুধবার ডান্ডাবেড়ি পারিয়ে আদালতে আনা হয়।
বৈধ নৌযান ১৫ হাজার অবৈধ দুই লাখ!

জঙ্গি ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া অমি গ্রেপ্তার : দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়ের মামলার আসামি মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফিকে (২৪) গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসি। গতকাল সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হলেও কোথায়, কখন গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি। ওই মামলার ১৪ নম্বর আসামি অমি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. ফারুক হোসেন কালবেলাকে বলেন, বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সিটিটিসি কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তথ্য দেবেন।

সিটিটিসি জানায়, অমি জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল। সে আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার সদস্য। তার বাড়ি সিলেট। ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গিদের রোববার মোহাম্মদপুর থানার যে মামলায় হাজিরা দিতে আনা হয়েছিল, অমিও হামলার আসামি হলেও জামিনে ছিল। ওই দিনও সে হাজিরা দিতে এসেছিল। হাজিরা দিতে এসেই সে নিজের সংগঠনের সহযোগীদের ছিনিয়ে নেয়। পুরো ঘটনা আগেই জানত সে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com