চোখ যে মনের কথা বলে/ চোখে চোখ রাখা শুধু নয়/ চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে/ চোখের মতো চোখ থাকা চাই...। কিন্তু জানেন কি—চোখ শুধু মনের কথা নয়; চিকিৎসকদের মতে, চোখ কখনো কখনো একজন ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবস্থারও জানান দেয়। এমনকি স্ট্রোকের মতো ভয়ংকর ঝুঁকির আভাসও জানা যায় চোখ দেখে। কীভাবে? তাই নিয়ে লিখেছেন বৃষ্টি শেখ খাদিজা
স্ট্রোকের ঘটনা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। এতে পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এখন আর বয়স্কদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি সীমাবদ্ধ নেই, কমবয়সীদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে এটি। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে ঘটে। কিছু রক্তনালি মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেয়। এই নালির মধ্যে কোনো কারণে বাঁধা তৈরি হলে বা ছিঁড়ে গেলে রক্ত পৌঁছাতে পারে না নির্দিষ্ট জায়গায়। ফলে সেই অংশের কোষ রক্তের অভাবে দ্রুত মরে যায়। এভাবেই স্ট্রোকের ঘটনা ঘটে। যে কোনো সময় হঠাৎ করেই হতে পারে স্ট্রোক। বিশেষ করে যারা অনিয়মিত জীবনযাপন করেন কিংবা স্থূলকায় তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি।
চোখ কীভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকির জানান দেয় তা নিয়ে এমডি, পিএইচডি, অপটোমেট্রি স্কুলের এক্সপেরিমেন্টাল অফথালমোলজির প্রফেসর এবং হংকংয়ের হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির শার্প ভিশনের গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক মিংগুয়াং হে জানান, যেখানে রক্তনালি সরাসরি আক্রমণাত্মকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় না, সেখানে রেটিনা হলো শরীরের এমন একটি অংশ যার রক্তনালিতে পরিবর্তন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, স্ট্রোক এবং অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত সেন্টার ফর আই রিসার্চের (CERA) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চোখের চেকআপ স্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিকভাবে পূর্বাভাস দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, চোখের পেছনের রক্তনালিতে বেশ কিছু ছাপ শনাক্ত করা গেছে। এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে স্ট্রোকের ঝুঁকি সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব। গবেষকরা দেখেছেন যে, একজন ব্যক্তির স্ট্রোকের ঝুঁকি রেটিনায় রক্তনালিগুলোর প্যাটার্ন এবং তাদের স্বাস্থ্যের লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চোখের রক্তনালিতে ১১৮টি স্বাস্থ্য সূচক রয়েছে, যা স্ট্রোকের ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে সহায়ক হতে পারে। এই লক্ষণগুলো ফান্ডাস ফটোগ্রাফির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, যা একটি সাধারণ হাতিয়ার। এটি নিয়মিত চোখের পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়। এ প্রক্রিয়াটি রেটিনাভিত্তিক মাইক্রো ভাসকুলার হেলথ অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম নামে একটি মেশিন লার্নিং টুলের মাধ্যমে করা হয়।
এ সিস্টেমটি ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের ৪৫ হাজার ১৬১ জনের চোখের ফান্ডাস ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১২.৫ বছরের গড় পর্যবেক্ষণে ৭৪৯ জনের স্ট্রোক হয়েছে। গবেষকরা চোখের মধ্যে স্ট্রোকের সঙ্গে যুক্ত ২৯টি লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তারা বলেছেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, বয়স এবং লিঙ্গের মতো সাধারণ সূচকগুলোর সঙ্গে রেটিনাল সংকেত ব্যবহার করে স্ট্রোকের ঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা একটি সহজ এবং কার্যকর উপায় হতে পারে।
স্ট্রোক একটি গুরুতর সমস্যা, যা বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে এবং প্রতি বছর প্রায় ৬৭ লাখ (৬.৭ মিলিয়ন) মৃত্যুর কারণ হয়। স্ট্রোক ধারণা এবং মৃত্যুহার কমাতে স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য এ ধরনের গবেষণা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোক নিয়ে গবেষণা করছেন; যেখানে তারা জানান, স্ট্রোকের উপসর্গ অনেক সময় আগেভাগে বোঝা যায় না। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ধরনের স্ট্রোক হওয়ার আগে কিছু উপসর্গ চোখে ফুটে উঠবে। হঠাৎ কথা বলতে গিয়ে জিভ অবশ হয়ে যাওয়া, হাত তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া, শরীরের এক পাশ অসাড় হয়ে যাওয়া—এ ধরনের সমস্যাগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে ঠিক হয়ে গেলেও, ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না, যা প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।
‘আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় পল মিশেল উল্লেখ করেন, স্ট্রোকের কিছু লক্ষণ চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, একপাশের দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চোখের সামনে কালো ছাপ বা রেখা দেখা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া—এগুলোই প্রাথমিক লক্ষণ। গবেষণায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন ৪০-৫০ বছরের মানুষকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, যাদের চোখের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা দৃষ্টি ঝাপসা, তাদের অনেকেই পরে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।
স্ট্রোকের আগে চোখে কেন পরিবর্তন ঘটে?
মস্তিষ্কের রক্তনালির ব্লকেজগুলো দৃষ্টিশক্তিতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। যেমন—ঝাপসা, অন্ধকার বা অস্পষ্ট দেখা ইত্যাদি।
তথ্য অনুসারে, স্ট্রোকের পর দৃষ্টিশক্তি ৮০ শতাংশ সময় ফিরে আসতে পারে, আবার অনেকে অন্ধত্ববরণও করতে পারেন।
যদি চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, তাহলে অপটিক স্নায়ুর সামনের অংশে অবস্থিত টিস্যুতে রক্ত প্রবাহের অভাবের কারণে দৃষ্টিশক্তির জন্য মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। যখন অপটিক স্নায়ু সম্পূর্ণরূপে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন এটি স্নায়ু টিস্যুর ক্ষতি করে। ফলে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হতে পারে। পেন ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট অনুসারে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ লোকই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এক চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবে চোখে কোনো যন্ত্রণা হয় না। ওয়েবসাইটের তথ্যে আরও জানানো হয়েছে, এ ক্ষেত্রে চোখে অন্ধকার বা ঝাপসা দেখা কিংবা আলোর প্রতি সংবেদনশীলতাও দেখা দেয়।
স্ট্রোকের বিভিন্ন কারণ
= ডায়াবেটিস
= উচ্চ রক্তচাপ
= রক্তে অতিরিক্ত চর্বি/কোলেস্টেরল
= ধূমপান, এ ছাড়া বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটির কারণেও স্ট্রোক হতে পারে।
স্ট্রোকের লক্ষণ
= হঠাৎ করে শরীরের একাংশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া
= মাথাব্যথা ও বমি হওয়া
= হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া
= কথা জড়িয়ে যাওয়া বা একেবারেই কথা বলতে
না পারা
স্ট্রোক প্রতিরোধ
= স্ট্রোক প্রতিরোধে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। জীবনাচারে পরিবর্তন আনতে হবে, অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার করতে হবে। কেউ যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খান, সেটি বন্ধ করতে হবে। ভাতের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া যাবে না। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসা
অবিলম্বে চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোক শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া হলেই চিকিৎসা কাজ করে। একবার ডাক্তার ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করলে, চিকিৎসা বেছে নেওয়া হয়। সব স্ট্রোক রোগীর একটাই লক্ষ্য—মস্তিষ্কের আরও ক্ষতি প্রতিরোধ করা
যদি স্ট্রোক মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহে বাধার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—
= T P A (টিস্যু প্লাজমিনোজেন অ্যাকটিভেটর), একটি ক্লট-বাস্টিং ড্রাগ; যা রক্তপাতহীন স্ট্রোক শুরু হওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে ইনজেকশন দেওয়া হয়।
= রক্ত পাতলা করে এমন ওষুধ, যার মধ্যে অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট (ওয়ারফারিন) এবং অ্যান্টিপ্লেটলেট ওষুধ (অ্যাসপিরিন বা টিক্লোপিডিন); অ্যাসপিরিন এবং টেকসই রিলিজ ডিপাইরিডামলের সংমিশ্রণ।
= সার্জারি, যা ঘাড়ের সংকীর্ণ রক্তনালিগুলোর ভেতরের অংশ খুলে দেয় (ক্যারোটিড এন্ডার্টারেক্টমি)।
যদি রক্তপাতের কারণে স্ট্রোক হয়, তাহলে চিকিৎসার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—
= ওষুধ যা স্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধা
বজায় রাখে।
= মস্তিষ্কে রক্ত অপসারণ বা মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমানোর সার্জারি।
= ভাঙা রক্তনালি ঠিক করতে সার্জারি।
= একটি কুণ্ডলী ঢোকানো, যা দ্বারা রক্তপাত বন্ধ করা।
= ওষুধ যা মস্তিষ্কের ফোলা প্রতিরোধ করে।
= চাপ কমাতে মস্তিষ্কের ফাঁপা অংশে একটি টিউব ঢোকানো।