সরকারি চাকরি ছেড়ে শীর্ষ জঙ্গি রণবীর

মাসুকুর রহমান ওরফে রণবীর।
মাসুকুর রহমান ওরফে রণবীর।ছবি : সংগৃহীত

জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার অন্যতম শূরা সদস্য ও সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান ওরফে রণবীর। এক সময় পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন তিনি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করা ছিল তার আরেকটি পেশা। ডাকাতি করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় গিয়েছেন কারাগারেও। আর কারাগার থেকেই জঙ্গিবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জেএমবিতে (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) যুক্ত হন। পরে ২০১৭ সালে জামা’আতুল আনসার প্রতিষ্ঠাকালীনও তার বিশেষ ভূমিকা ছিল।

কক্সবাজারের উখিয়া থেকে রণবীর ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর মোবাইল ফোন থেকে পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠনটির সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের একটি ভিডিও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। ভিডিওতে দেখা যায়, বান্দরবানের দুর্গম অঞ্চলের কয়েকটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে জঙ্গি সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণে কীভাবে অস্ত্র বহন করবে, অস্ত্র বহনের সময় হাত, হাতের আঙুল কোথায় থাকবে, টহলকালীন ও ব্লক করার সময় তাদের অবস্থান কেমন হবে, কীভাবে রাতের আঁধারে পথ চলতে হবে ইত্যাদি শেখানো হয়।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ভিডিওটি প্রদর্শন করা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গত সোমবার ভোরে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পাশের জঙ্গল থেকে রণবীর ও তার সহযোগী আবুল বাশার মৃধা ওরফে আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাসুকুর রহমানের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। সেই ফোনেই পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠনটির সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের একটি ভিডিও পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, জামা’আতুল আনসারের সামরিক কার্যক্রম দেখভাল করতেন রণবীর। ২০০৭ সালের আগে তিনি পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। ২০১৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে জামা’আতুল আনসারে যোগ দেন। ২০২১ সালে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের সময় মাসুকুর উপস্থিত ছিলেন। পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণের রূপরেখা নির্ধারণেও তিনি ভূমিকা রাখেন। রণবীর তার সামরিক কার্যক্রমে দুটি শাখা, যার একটি পাহাড়ে এবং অন্যটি সমতলে। দুটি ক্যাম্পের জন্য দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিডিওতে সাব্বির ওরফে কারসে এবং দিদার ওরফে চাম্পাই নামের ওই দুজনকে দেখা গেছে। ভিডিওতে সালেহ ও আল-আমিন নামে আরও দুজনকে দেখা গেছে। কয়েক দিন আগে এই সালেহ বান্দরবানে শারক্বীয়ার দুই সদস্যের কবরের সন্ধান দিয়েছিলেন।

ভিডিও সম্পর্কে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, জামা’আতুল আনসারের সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমানকে এই ভিডিও করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। মূলত যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আছেন এবং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাদের আরও উদ্বুদ্ধ করতে এই ভিডিও করা হয়। সংগঠনটির সামরিক শাখায় যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাদের করণীয় কী হবে, সেই বিষয় সামনে রেখেই এই ভিডিও করা হয়েছে। সমতলে অবস্থানকারী বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভিডিও দেখিয়ে উদ্বুদ্ধ করাও ছিল তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

র‌্যাব জানায়, গত বছরের ২০ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিলাইছড়ি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় জামা’আতুল আনসারের সাত জঙ্গি এবং তাদের সহায়তাকারী তিনজন কেএনএফ (বম পার্টি) সদস্যকে আটক করা হয়। সেখানে গ্রেপ্তারদের মধ্যে জামা’আতুল আনসারের সামরিক শাখার উপপ্রধান সৈয়দ মারুফ আহমেদ মানিকও ছিলেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান রণবীরের কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, অক্টোবর মাসে র‌্যাব কথিত হিজরতের নামে বাড়িছাড়া যে ৫৫ জনের তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে আবুল বাশারের নামও ছিল। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই বাশার জানিয়েছেন, গত বছরের ৩ অক্টোবর র‌্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান শুরু হওয়ার পর তিনি তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড় থেকে পালিয়ে সিলেটে যান। সেখানে সামরিক শাখার প্রধান রণবীরের কাছে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তারা দুইজন বেশ কিছু দিন আগে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে আত্মগোপন করেন।

দুই জঙ্গি কারাগারে: বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, গ্রেপ্তার দুই জঙ্গি সিলেটের কোতোয়ালি থানার মোহাম্মদপুর গ্রামের মাসকুর রহমান ও মাদারীপুরের রাজৈর থানার সরমঙ্গল গ্রামের আবুল বাসার মৃধাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বান্দরবানের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা সুরাইয়া আক্তার তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বান্দরবান আদালত পুলিশ পরিদর্শক (জিআরও) আব্দুল মজিদ জানান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তাদের পরবর্তী মামলার ধার্য তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করেছেন আদালত।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com