প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মতো রমজান মাসের রোজাও প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের প্রতিও; যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)
আল্লাহপ্রেমিক বান্দারা সারা বছর রমজানের প্রতীক্ষায় থাকেন। এতদসত্ত্বেও কিছু মানুষ শয়তানের প্ররোচনায় ও নফসের ধোঁকায় অকারণে রমজানের রোজা পরিত্যাগ করেন। যারা অকারণে রোজা ভেঙে ফেলেন তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। হজরত আবু উমামা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি—‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এলো। তারপর আমাকে বলল, আপনি পাহাড়ের ওপর উঠুন। আমি বললাম, আমি তো উঠতে পারব না। তারা বলল, আমরা আপনাকে সহজ করে দেব। আমি ওপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছলাম, হঠাৎ ভয়ংকর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এসব কীসের আওয়াজ? তারা বললেন, এটা জাহান্নামিদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদের পায়ের মাংসপেশি দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ও তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললাম, এরা কারা? তারা বললেন, যারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোজা ভেঙে ফেলে।’ (ইবনে খুজাইমা: ১৯৮৬; ইবনে হিববান: ৭৪৪৮)
কেউ যদি কোনো ওজর ছাড়া রোজা ভাঙে বা না রাখে তাহলে তার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, এতে আল্লাহতায়ালা ক্রোধান্বিত হন। শাস্তি কী হবে, এটা বলা হয়নি। ক্রোধান্বিত হয়ে আল্লাহতায়ালা যা ইচ্ছা শাস্তি দিতে পারেন। কারও ওপর আল্লাহতায়ালা ক্রোধান্বিত, এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে! রমজান মাসের একটি রোজার মর্যাদা সারা জীবন কাজা পালন করেও অর্জন করা সম্ভব নয়। রমজানে ভেঙে ফেলা রোজার বিনিময় কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়। একটি রোজার পরিবর্তে সারা জীবন রোজা আদায় করলেও যথেষ্ট হবে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রয়োজন ও রোগ ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভেঙে ফেলল, তার সারা জীবনের রোজা দ্বারাও এই কাজা আদায় হবে না, যদিও সে সারা জীবন রোজা পালন করে।’ (বোখারি, হাদিস: ১৮১১)
রোজা এমন জিনিস নয় যে, তা একজন সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না। সে যা ভালো কাজ করেছে তার ফল পাবে এবং যা খারাপ করেছে তা তার বিরুদ্ধে যাবে।’ (সুরা বাকারা: ২৮৬)। সমাজে এমন অনেক মেহনতি মানুষ আছেন, যারা রিকশা চালান, ক্ষেতে বদলি দেন, কায়িক শ্রম দেন, তারাও তো রোজা রাখছেন। মূলত বিষয়টা হলো ইচ্ছার ওপর নির্ভর। যে যেভাবে ইচ্ছা করে, আল্লাহতায়ালা তাকে সেভাবে রাখেন। অন্যান্য দিনে দু-তিন বেলা না খেয়ে থাকাটা কষ্টকর হলেও রোজা রাখাতে আল্লাহতায়ালা অনেক সহজ করে দিয়েছেন। ফিনল্যান্ডের মুসলমানরা ২৩ ঘণ্টা রোজা রাখছেন, তারা একটি দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২৩ ঘণ্টাই যদি না খেয়ে থাকতে পারেন, তাহলে অন্যান্য দেশের মানুষ, যেখানে ১২-১৪ ঘণ্টা দিন থাকে, তারা ফিনল্যান্ডের অধিবাসীদের তুলনায় এ সামান্য কয়েক ঘণ্টার রোজা রাখতে পারবে না কেন! তাই আসুন, আমরাও শপথ করি, অকারণে ভাঙব না আর রোজা। করব না আর পাপ। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।
লেখক: মুহাদ্দিস ও ইসলামী চিন্তাবিদ
মন্তব্য করুন