বৈরী সময়ে মেসিদের আনতে হবে কেন

বৈরী সময়ে মেসিদের আনতে হবে কেন
প্রতীকী ছবি

বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রত্যেককে মিতব্যয়ী, সাশ্রয়ী ও সঞ্চয়ী হতে অনুরোধ করছেন। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নির্দেশনা দিচ্ছেন। দেশের এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ১০০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করে আর্জেন্টিনা দলকে ঢাকায় আনতে কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)—এমন খবর বেরিয়েছে গণমাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হবে। আর্জেন্টিনার সঙ্গে মরক্কো বা জাপান খেলতে পারে বাফুফে সূত্রে সে খবরও দিয়েছে গণমাধ্যম। এ জন্য আর্জেন্টিনাকে ৭ মিলিয়ন এবং অন্য দলকে ৩ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এর সঙ্গে থাকবে আয়োজন, আতিথেয়তা এবং অন্যান্য খরচ। সব মিলিয়ে হয়তো খরচ হবে ১১০ কোটি টাকারও বেশি।

বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনাকে কেন ঢাকায় আনতে হবে? এর দুটো দিক আছে। একটি আর্জেন্টিনার দিক থেকে। আরেকটি বাংলাদেশের দিক থেকে। শোনা গেছে, আর্জেন্টিনার হাজার হাজার মানুষ তাদের ফুটবল ফেডারেশনের কাছে দাবি জানিয়েছে বিশ্বকাপসহ মেসির দলকে বাংলাদেশ সফরে পাঠানোর জন্য। কারণ তারা জেনেছেন আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশিসংখ্যক সমর্থক রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের এ সমর্থকরা পাগলের মতো কীভাবে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে সে কর্মকাণ্ড তারা বিশ্বকাপের সময় দেখেছেন তাদের দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। প্রবল সমর্থনের খবর পড়েছেন বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় ও নিউজ পোর্টালে। বাংলাদেশের এ সমর্থকদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সমর্থনের প্রতিদান দিতেই মেসির দলকে ঢাকায় পাঠানোর দাবি তাদের। খুবই ভালো ব্যাপার। এ জন্য মেসিরা ঢাকায় এলে নিশ্চয়ই তাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের সংবর্ধনা ও আতিথেয়তার ব্যবস্থা করা যায়। তাদের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্মরণীয় উপহারও দেওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমর্থকদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সমর্থনকে সম্মান জানাতে মেসিরা ঢাকায় আসবেন, এ জন্য তাদের ৭ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে এটি ঠিক মেনে নেওয়া যায় না।

আর্জেন্টিনাকে বাংলাদেশে আনার ব্যাপারে কয়েকটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে বাফুফের। একটি বাংলাদেশের মানুষকে কাছ থেকে মেসিদের দেখার সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু কতজন সে সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি হয় এবং তাদের মধ্যে ফুটবলপাগল হয় অর্ধেক ৮ কোটি। তারও অর্ধেক যদি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়, তবে সে সংখ্যা হবে ৪ কোটি। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তো ৫০ হাজারের বেশি মানুষ খেলা দেখতে পারবেন না। এর মধ্যে তো বাফুফের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের পরিচিতজন এবং স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের বদান্যতায় বিপুলসংখ্যক লোক ঢুকবেন বিনা টিকিটে। অতীতে তাই হয়েছে। তাহলে কোটি কোটি মানুষকে তো সেই টেলিভিশনেই মেসিদের দেখতে হবে। তাহলে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে মেসিদের এনে কী লাভ?

আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে এ ম্যাচকে কেন্দ্র করে বাফুফের ফান্ড স্ফীত করা। নানান ধরনের বিপণন, স্পন্সর, প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে টাকা তোলা যেতে পারে। কিন্তু এ জন্য যে ইমেজ, সামর্থ্য, সাংগঠনিক দক্ষতা, নেটওয়ার্ক থাকা দরকার সেটি কি বাফুফের আছে? একেবারেই নেই। তার প্রমাণ আজ থেকে ১২ বছর আগে ৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ঢাকায় আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়াকে এনে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ আয়োজন করেছিল বাফুফে। তা থেকে কোনো লাভ করা তো দূরের কথা, ধার করে খরচ করা লোন ১৩ বছরেও শোধ করতে পারেনি বাফুফে। বিভিন্ন টুর্নামেন্টের সময় বিলবোর্ড, বিজ্ঞাপন ব্যানার টানিয়ে পাওনাদারদের টাকা অ্যাডজাস্ট করা হচ্ছে এখনো। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাফুফের অস্বচ্ছতার কারণে এ আয়োজনে অর্থ এদিক-সেদিক করা নিয়ে সত্য-মিথ্যা সংবাদ-গুজব রটবে। দুর্নীতির অভিযোগে ফিফা বাফুফের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এরই মধ্যে শোকজ করেছে। বাফুফে ব্যাপারটি খোলাসা করেছে বলে এখনো জানা যায়নি।

আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে ইমেজ বৃদ্ধি করা। এই যেমন সৌদি আরব করার চেষ্টা করছে। ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায় তারা। এ জন্য তারা তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে চায় বিশ্বের সামনে। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তাদের ফুটবল দল সৌদি ফুটবলের ইমেজ বৃদ্ধি করেছে। এখন স্পেনের কোপা দেল রে’র ফাইনাল-এল ক্ল্যাসিকো, পিএসজির সঙ্গে সৌদি লিগের অলস্টার দলের ম্যাচ আয়োজন করে সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। লস দিয়ে কিন্তু তারা এটি করছে না। প্রতিটি আয়োজন থেকেই লাভ করছে। মাঠের পারফরম্যান্সের পরই তারা আয়োজনে দক্ষতা দেখাচ্ছে। ২০১১ সালে যখন বাফুফে আর্জেন্টিনাকে এনেছিল তখন বাংলাদেশের ফিফা র‍্যাঙ্কিং ছিল সম্ভবত ১৫৭, এখন সেটি ২১১ দেশের মধ্যে ১৯২। দেশের ফুটবল যখন ক্রমেই নিচে নামছে তখন এ ধরনের কোনো ম্যাচ আয়োজনই বাফুফের ইমেজ বাড়াতে পারবে না।

অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে দেশজুড়ে ফুটবলের আগ্রহ তৈরি করা, জাগরণ ঘটানো। বাফুফের কর্তাদের গেল ১২-১৪ বছরের কর্মকাণ্ডে তাদের প্রতি গণমানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা এ ম্যাচ আয়োজন করে কাটানো সম্ভব নয়। গণজাগরণের জন্য দরকার ভিশনারি নেতৃত্ব, উন্নয়নের রোডম্যাপ এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ। অনেকেই বলবেন, বাফুফে কর্তারা তো সবসময়ই বলেন—ফুটবলের জন্য স্পন্সর পাওয়া যায় না। টাকা কেউ দিতে চায় না। আর্জেন্টিনাকে আনলে স্পন্সর পাওয়া যাবে। এটি ঠিক নয়। নানা চাপে, প্রভাবে অনেকে স্পন্সর হতে বাধ্য হয়। এটি ২০১১ সালেও দেখা গেছে। কিন্তু ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস যখন পেয়েছিল বাংলাদেশ, তখনো ক্রিকেটে টাকা ছিল না। কিন্তু বিসিবির পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড দেখে স্পন্সররা বাংলাদেশের ক্রিকেটের পাশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে বাফুফের কি কোনো ভিশন আছে? রোডম্যাপ আছে? কিন্তু আমাদের পাশের দেশ ভারত ২৪ বছর মেয়াদি ভিশন-২০৪৭ ঘোষণা করেছে এই কদিন আগে। ২০২৬ সালে তারা এশিয়ার সেরা দশে থাকে চায়। ২০৩৬ সালে এশিয়ার সেরা সাতে থাকতে চায়। বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে চায়। ২০৪৭ সালে চায় এশিয়ার সেরা চারে থাকতে এবং বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে। দেশের ফুটবল উন্নয়নের জন্য বাফুফে কর্তাদের এসব দিকেই তৎপর হওয়া দরকার। ভিশন থাকলে, পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কাজ শুরু করলে, মানুষ আস্থাবান হয়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে সাফল্য এসে ধরা দেয়। বাংলাদেশ তার বড় উদাহরণ। ২০০৮ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিলেন, তখন টাকা ছিল না, অভিজ্ঞতা ছিল না, জনবল ছিল না; কিন্তু ইচ্ছে ছিল, সংকল্প ছিল, তাই সেটির বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন যে স্মার্ট বাংলাদেশ-২০৪১-এর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, তা দেখলে যে কেউ আশাবাদী হবেন। বাফুফেরও উচিত এমন পরিকল্পনা তৈরি করে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে দেশের মানুষকে আস্থায় নেওয়া। তখন টাকার অভাব হবে না। স্পন্সররা এগিয়ে আসবে। মানুষ ফুটবল নিয়ে আশাবাদী হবে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। ফুটবলে জাগরণ ঘটবে।

তা না করে বিপুল পরিমাণের ডলার খরচ করে মেসিদের আনার মতো তৎপরতা চালালে মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। বাফুফের নেতিবাচক ইমেজ আরও বাড়বে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনই যা দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা জটিল। সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নানাভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। ডলারের সংকট কাটাতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রবাসীরা যেন রেমিট্যান্স ব্যাংক চ্যানেলে বেশি করে পাঠান সে জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এমনকি পণ্য আমদানির এলসি খুলতেও নানা বাধা-নিষেধ দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে কৃচ্ছ্রের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ১০ মিলিয়ন ডলার একটি ম্যাচের জন্য ব্যয় করা দেশের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়। ১০০ কোটি টাকার এ ম্যাচ আয়োজনের চেয়ে বাফুফে যদি ভারতের চারটি এবং বাংলাদেশের চারটি ক্লাব নিয়ে পদ্মা-গঙ্গা কাপ আয়োজন করে তাহলেও স্পন্সর পাবে। মানুষ অনেক বেশি ফুটবল উপভোগ করবে। দেশজুড়ে এই কাপ সাড়া ফেলবে। দেশের ফুটবল, ফুটবলাররা উপকৃত হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, ক্রীড়া বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com