শিরোনাম দেখে কেউ হয়তো ধন্দে পড়ে যেতে পারেন। সন্দেহ জাগতে পারে আমি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে এক কাতারে শামিল করতে চাচ্ছি কি না। মোটেও তা নয়। বরং আমি মনে করি, আমাদের পূর্বাপর সব অর্জনের মধ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সর্বশ্রেষ্ঠ ও অতুলনীয় অর্জন। একাত্তরের অর্জনের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনাই হতে পারে না। কেননা, একাত্তর আমাদের একটি প্রকৃত স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি জাতীয় পতাকা ও জাতি হিসেবে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে। আমরা আজ নিজেদের ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ বলে গর্বের সঙ্গে যে পরিচয় দিতে পারি, তা এনে দিয়েছে একাত্তর। কিন্তু ১৫ বছর ৭ মাসের শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর গত বছর ৫ আগস্ট থেকে কেউ কেউ কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো সুকৌশলে চব্বিশকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করাতে গলদঘর্ম হচ্ছেন। তারা সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি, সভা-সমাবেশে বক্তৃতা এবং ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে এমনভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে জনমনে একাত্তর নিয়ে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। তারা কারা, তা কারোরই অজানা থাকার কথা নয়।
একাত্তরের স্বাধীনতা আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দুটোই আমাদের গর্বের অর্জন। দুটোর জন্যই মুক্তিপাগল মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। একটিতে আমরা অবতীর্ণ হয়েছিলাম সশস্ত্রযুদ্ধে। যার ফলে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি। অন্যটিতে রাজপথে নেমেছিলাম খালিহাতে। দুটি অর্জনের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য থাকার কথা নয়। একটি আমাদের স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যটি একটি চরম ফ্যাসিবাদী শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। অথচ, একটি মহল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মহিমাকে ক্ষুণ্ন করার অসদুদ্দেশ্যে শুরু থেকেই গত বছর ৫ আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানকে আমাদের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করে। যারা একাত্তরের মহিমাকে গৌণ প্রতিপন্ন করতে চাচ্ছেন, তারা বোধকরি এটা বিস্মৃত হয়েছেন যে, আজ যে স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছেন, তার ভিত্তিভূমি একাত্তর। আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরপর এ ধরনের প্রচারণা দেখে আমি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘স্বাধীনতা বারবার আসে না’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে মন্তব্য করেছিলাম, “একটি কথা মনে রাখা দরকার, একটি জাতির জীবনে মুক্তি একাধিকবার আসতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা আসে একবারই, বারবার নয়। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ১৯৭১ সালে। এরপর আমরা নানা সময়ে নানা ধরনের দুঃশাসন থেকে মুক্তি লাভ করেছি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আমরা নয় বছরের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। এবার তেমনি আরেকটি শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। এ দুটি দিবস অবশ্যই স্মরণীয় এবং এ অর্জনের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তারাও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সুতরাং সাম্প্রতিক আন্দোলনকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ৫ আগস্টকে ‘দ্বিতীয় বিজয় দিবস’ বলা সুবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয় না। বরং আমরা এ দিনটিকে ‘গণতন্ত্রের মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালন করতে পারি। আর সেটাই হবে যুক্তিযুক্ত।” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ আগস্ট, ২০২৪)। তারপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। তবে ৫ আগস্টকে ‘দ্বিতীয় বিজয় দিবস’ বা গণঅভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস থেকে তারা বিরত হয়নি। তাদের কেউ কেউ পারলে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ‘১৯৭১’ সাল এবং ‘১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চ’ তারিখ দুটি মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণেই তা সম্ভবপর হবে না। যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল একাত্তরের ২৭ মার্চ মেজর জিয়ার বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার জন্য দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে, তার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
একাত্তর কিন্তু একদিনে আসেনি। এজন্য পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ, অবগাহন করতে হয়েছে রক্তের মহাসাগরে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে যে কথিত স্বাধীনতা আমরা ১৯৪৭ সালে পেয়েছিলাম, তা না ছিল স্বাধীনতা; না ছিল মুক্তি। তাই আমাদের পুনরায় নামতে হয়েছিল নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তারপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, একাত্তরের ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা এবং সবশেষে ২৭ মার্চ মেজর জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা। একটি জাতির স্বাধীনতা তথা মুক্তি অর্জনের জন্য এতটা দুর্গম পথ অতিক্রম ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছিল গোড়াতেই। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ক্ষমতাসীন দলটি এর কৃতিত্ব বগলদাবা করতে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা বোঝাতে চাইত, এ দেশের স্বাধীনতা শুধু ওই দলটির একক কৃতিত্ব। স্বাধীনতার সপক্ষের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সেগুলোর নেতৃত্ব এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অবস্থান করে মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতাকারী আপামর জনগোষ্ঠীর অবদান তারা অস্বীকার করার প্রয়াস পায়। তাদের এ অপতৎপরতার জবাব দিয়েছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক এনায়েতউল্লাহ খান (মরহুম) তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় ‘সিক্সটি ফাইভ মিলিয়নস অব কোলাবোরেটর্স’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে। সম্পাদকীয় নিবন্ধটির মর্মার্থ ছিল, ক্ষমতাসীনদের প্রচারণাদৃষ্টে মনে হয় একাত্তরে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী এক কোটি শরণার্থী ছাড়া দেশের বাকি সাড়ে ছয় কোটি মানুষই পাকিস্তানের দালাল (কোলাবোরেটর) ছিল। এনায়েতউল্লাহ খানের সম্পাদকীয় সে সময় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নিরেট সত্যি হলো, কতিপয় রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান-মেম্বার ছাড়া গোটা দেশের মানুষ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু তারপরও আওয়ামী লীগের সে প্রচারণা বন্ধ হয়নি। বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে বসত তাদের গল্প বলার জমজমাট আসর। অসত্য-অর্ধসত্য কাহিনি প্রচার করে তারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার একক মালিকানা দখল করতে চেয়েছিল। তবে তারা সফল হতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের স্বাধীনতার একক মালিকানা দাবির পাশাপাশি আরেকটি অপচেষ্টা শুরু থেকেই চলে আসছে। সেটা হলো আমাদের স্বাধীনতাকে প্রতিবেশী ভারতের ‘ষড়যন্ত্রের ফসল’ বলে জনমনে ধারণা দেওয়া। এ মহলটি এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে, ভারত তাদের স্বার্থে পাকিস্তানকে দুই টুকরো করার অভিপ্রায়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে। বলা নিষ্প্রয়োজন, একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর এ দেশীয় দোসররাই এ প্রচারণার প্রকাশ্য ও নেপথ্য কুশীলব। এতদিন তারা একটু রেখেঢেকে তা প্রচার করলেও গত বছর আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রকাশ্যেই বলা শুরু করেছে। তারা এমন বলার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে যে, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ভুল এবং তা ছিল ‘দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া’। এসব প্রচারণার দ্বারা তারা যে আমাদের মহান স্বাধীনতার মহিমাকে ম্লান করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, তা না বললেও চলে। এ প্রচারণা দেশপ্রেমিক জনসাধারণের কাছে আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করছে। কেননা, তারুণ্যনির্ভর আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য কখনোই স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি ছিল না। ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনের চির অবসান ঘটিয়ে আমাদের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা।
এ বছর আমাদের মহান জাতীয় ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়েছে ভিন্ন এক পরিবেশে। এই মহান দিবসেও অনেকের কথায় একাত্তর ও চব্বিশকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস লক্ষ করা গেছে। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর আলোচনা সভায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এর চেতনা ফেরি করে বেড়াচ্ছেন, তাদের বলব, আপনারা কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে, ক্ষমতার স্বার্থে দিল্লির কাছে দেশ বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। সেদিন বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন হয়নি। যে কারণে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে কোটি কোটি মানুষ বলেছে, এটাই আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা।’ (২৭ মার্চের পত্রিকা)। অন্যদিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন করে স্বৈরাচারকে তাড়িয়ে একটা নতুন স্বাদ পেয়েছি। অনেকে বলে দ্বিতীয় স্বাধীনতা। আসলে আজ স্বাধীনতা দিবস প্রমাণ করে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে কিছু নেই।’ (কালবেলা, ২৭ মার্চ, ২০২৫)। এর আগে ভিন্ন একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘একাত্তর ও চব্বিশ সমান—এটি মূলত তারা বলেন, যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। উল্টো একাত্তরের হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করেছেন। তাদের কেউ কেউ এখন গলা উঁচিয়ে বলার চেষ্টা করছে যে, ৭১ সালে কিছু হয়নি। কিছু কিছু দল বোঝানোর চেষ্টা করছে, মুক্তিযুদ্ধ কোনো ঘটনাই ছিল না।’ (২৬ মার্চ, ২০২৫)। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘একাত্তর ও চব্বিশ পরস্পরবিরোধী নয়। আমরা সেই ধারাবাহিকতাতেই আছি।’ তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের সংগ্রাম ও সাতচল্লিশের আজাদির লড়াই—এসব কিছুর ভেতর দিয়ে আমরা যে স্বাধীন-সার্বভৌম মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র পেতে চেয়েছিলাম, তার একটি সুযোগ ও সম্ভাবনা আমাদের গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হয়েছে।’ (কালবেলা, ২৭ মার্চ ২০২৫)। নাহিদের মন্তব্যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের স্বীকৃতি স্পষ্ট। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের ধারাবাহিকতায় একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এ স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি। কিন্তু কখনো একদলীয় স্বৈরশাসন, কখনো ফ্যাসিবাদী শাসন স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত স্বাদ জনসাধারণকে পেতে দেয়নি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের ফলে নতুন আবহ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এ পরিবেশে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তাকে ফলপ্রসূ করাই হবে দায়িত্বশীল নাগরিকদের প্রধান কাজ।
এ দেশের মানুষের চিরকাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের পথে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে তা কোনোমতেই একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিস্থাপন হতে পারে না। একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি দেশকে স্বাধীন করার জন্য আর ২০২৪-এ আমরা লড়াই করেছি ফ্যাসিবাদী শাসনের উৎখাতের জন্য। একটি আরেকটির পরিপূরক, বিপ্রতীপ নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন