পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব মসজিদ নিয়ে ‘শত মসজিদের শাশ্বত কথা’ নামের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের বইমেলা উপলক্ষে। বইটি লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ। বইটির চতুর্থ অধ্যায় ‘আরাফাতকেন্দ্রিক চারটি মসজিদ’ থেকে পাঠকের জন্য আজ থাকছে ‘নামিরাহ মসজিদ’।
মসজিদ নামিরাহ সৌদি আরবের মক্কার নিকটবর্তী ওয়াদি উরানা নামক স্থানে অবস্থিত। নবী করিম (সা.) হিজরি ১০ সালের ৯ জিলহজ যখন বিদায় হজ আদায়ের জন্য আরাফাতে ছিলেন, তখন তিনি এখানে শিবির স্থাপন করেন। মধ্যাহ্নের পর তিনি উরানা উপত্যকায় তার বিখ্যাত খুতবা (বিদায় ভাষণ) প্রদান করেন। এরপর তিনি হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতার নেতৃত্ব দেন। তার সঙ্গে এক লাখেরও বেশি সাহাবা এসেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) জনগণের উদ্দেশে ভাষণ শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মর্মে ওহি লাভ করেন যে, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম ও ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ ইসলামের দ্বিতীয় শতাব্দীতে যে স্থানে মহানবী (সা.) খুতবা পাঠ ও নামাজের ইমামতি করেছিলেন, সেখানেই নামিরাহ মসজিদ নির্মিত হয়।
উল্লেখ্য, ওয়াদি উরানা অর্থাৎ যেখানে খুতবা দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল আরাফাতের সীমানার বাইরে। তাই প্রাথমিকভাবে মসজিদের এ অংশটিও স্বাভাবিকভাবে সীমানার বাইরে ছিল। পরে যখন মসজিদটি সম্প্রসারিত হয়, তখন তা দুই ভাগে বিভক্ত হয়। সামনের অংশটি ছিল মূল মসজিদের অবস্থানের ওপর, যা আরাফাতের বাইরে ও পেছনের অংশটি আরাফাতের সীমানার মধ্যে ছিল। সংস্কারের পর, মসজিদের ভেতরে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়, যাতে হাজিরা এ বিষয়ে অবহিত থাকেন এবং নিয়ম মোতাবেক হজের সময় জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে জামাতে আদায় করার পর তারা হয় মসজিদের পেছনে বা বাইরে আরাফাতের দিকে তাদের বাকি সময় কাটাতে পারেন। যদি কোনো ব্যক্তি মধ্যাহ্ন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সবসময় মসজিদের সামনের অংশে কাটায়, তাহলে তার আরাফাতে অবস্থান বাতিল হবে এবং তার হজ অসম্পূর্ণ হবে।
সৌদি সরকার প্রদত্ত তথ্যমতে, বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদের শাসনামলে নামিরাহ মসজিদের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন ২৩৭ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল। আজ এটি মক্কা অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত এবং কাবা বা গ্র্যান্ড মসজিদের পরেই এ মসজিদের অবস্থান। ১ লাখ ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এ মসজিদে চার লাখ মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রসারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ৬টি মিনার, ৩টি গম্বুজ, ৬৪টি দরজাসহ ১০টি প্রধান প্রবেশপথ এবং একটি ছায়াযুক্ত প্রশস্ত প্রাঙ্গণ নির্মাণ। একটি বাহ্যিক রেডিও রুম ও উপগ্রহ থেকে এখানকার হজের খুতবা এবং হজের আনুষ্ঠানিকতা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। নামিরাহ মসজিদ ইসলামের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রমাণ বহন করে। ক্রমাগত সংরক্ষণ ও আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টার মাধ্যমে সৌদি আরব এ পবিত্র মসজিদের তাৎপর্য বজায় রাখে এবং আগত হজযাত্রীদের পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানে নিয়োজিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর। গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন