ছোটবেলা থেকেই একটি প্রবাদ শুনে এসেছি—‘মামা-ভাগনে যেখানে, বিপদ নাই সেখানে’। পরবর্তীকালে সিনেমা ও নাটকেও এই প্রবাদ শুনেছি বহুবার, বহু রঙে, বহু ঢঙে। অন্যদিকে আবার কেউ বাড়তি আবদার করলে বা অযৌক্তিক কিছু চেয়ে বসলে বলা হতো ‘মামাবাড়ির আবদার পেয়েছ?’ ভাবখানা এমন, যেন মামাবাড়ি গেলেই সব আবদার পূরণ হয়। এদিকে গিন্নিদের যতই আপত্তি থাকুক, জেন-জির তরুণ সমাজ বাস, রিকশা, অটো বা টেম্পোচালক কিংবা ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, ডালপুরি বিক্রেতাদের এমন কণ্ঠে মামা ডাকেন, যেন তারা তাদের মায়ের আপন ভাই। মহিলা হোস্টেল বা ছাত্রীনিবাসে সেবাদাতা সবার একটাই পরিচয় মামা কিংবা খালা।
যত্রতত্র যাকে-তাকে মামা ডাকলে মায়েরা বিব্রত না হলেও মামাবাড়িতে মামিরা বিব্রত হন একটি ছড়ার কারণে। ছড়াটি হলো—
‘তাই তাই তাই’ মামা-খালার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠার চিরায়ত এমন ছন্দে ছেদ পড়েছিল ১৭৫৭ সালে। তখন বাংলা-বিহার-ওড়িশার স্বাধীন শাসক ছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌলা। আর তার খালা ছিলেন ঘসেটি বেগম। বাংলার নবাবকে উৎখাত করতে ইংরেজদের চক্রান্ত আর মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গী হন খালা ঘসেটি বেগম। ফলে সিরাজের পতন ঘটে। একজন খালার কারণে তার আপন বোনের সন্তানের এমন দুর্ভাগ্য আজও কাঁদায় স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালিদের।
মামার বাড়ি যাই
মামা দিল দুধ ভাত
পেট ভরে খাই
মামি এলো লাঠি নিয়ে
পালাই-পালাই।
বাস্তবে মামিরা যতই আদর-যত্ন করুক না কেন, এ ছড়ার কারণে তাদের মূল্যায়ন হতো না বা এখনো হয় না বলা চলে।
এদিকে খালারা পড়েছেন আরেক বিপদে। ধর্মভেদে খালার আরেক পরিচয় মাসিরূপে। আর মাসিরা তথা খালারা বাড়তি আদর-যত্ন করলেই ফোড়ন কেটে বলা হয়—‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’। যারা আবার একমাত্রা বেশি বোঝেন, তারা হয়তো বলে ওঠেন—‘মায়ের চেয়ে যার দরদ বেশি, সে হলো ডাইনি’।
এরপর কেটে গেছে আড়াইশ বছরেরও বেশি সময়। এমন দীর্ঘ বিরতির পর আরেক খালার কারণে খোদ বিলেতে এক মন্ত্রীর মন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে অতিসম্প্রতি। ফুলের নামে ছিল মন্ত্রীর নাম। তার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র হবে ভেবেই হয়তো তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সরকারি কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধকল্পে দেখভাল করা। সম্প্রতি লন্ডনের অভিজাত এলাকায় এই পূতপবিত্র মানুষটির একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়, যা তিনি উপহার পেয়েছেন। তবে এ উপহার তিনি তার স্বামী, সন্তান বা কোনো নিকটাত্মীয় থেকে পেলে হয়তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু না, তিনি উপহার পেয়েছেন একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে।
আর এ ব্যবসায়ীর পরিচয় খুঁজতে গিয়েই বেরিয়ে এলো ওই মন্ত্রীর তথাকথিত খালার নাম ও খালার কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি। এই খালা ছিলেন প্রায় ১৬ বছর একটি দেশে কঠোর শাসন চালানো প্রধানমন্ত্রী, যিনি অতিসম্প্রতি পাশের দেশে বেড়াতে গিয়ে আর ফিরছেন না। এই খালা তথা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক ছিলেন সেই ব্যবসায়ী, যিনি ব্রিটিশ মন্ত্রীকে বিনামূল্যে একটি বাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে এমন উপহারের নেপথ্যে কার কী স্বার্থ থাকতে পারে, তা বুঝতে সময় নিল না। এমন পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালল এক বিতর্কিত ছবি। সেই ছবিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বহু অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে এমন একটি দেশে একসঙ্গে ভ্রমণে গেছেন খালা-বোনঝি। সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তোলা ছবিটি ব্রিটিশ গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করে। কারণ এ দেশটি অন্য দেশে একই সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যে টাকা খরচ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করে একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে খালার দেশে। আর অতিরিক্ত টাকা আদায়, বণ্টন ও বিদেশে গ্রহণের কাজটি খালার পক্ষে বোনঝি অর্থাৎ সেই ফুলের নামে নামবিশিষ্ট মন্ত্রী ঠিক করেছিলেন বলে রব ওঠে খোদ ব্রিটিশ মুল্লুকে। এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সংসদ ও সংবাদ জগতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন বোনঝি। তাই বলা চলে, ১৮৫৭ সালে খালার কারণে ক্ষমতা হারানোর পুনরাবৃত্তি ঘটল এই ২০২৫ সালে এসে।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নানা আলীবর্দী খানের খান তার বৈমাত্রেয় বোন শাহ খানুমকে বিয়ে দেন মীরজাফরের সঙ্গে। আর আলীবর্দী খানের নিজ কন্যা আমিনার সন্তান ছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। এই সূত্রে নানা হয়েও মীরজাফর তার নাতি তথা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অন্যতম কুশীলব ছিলেন। নানার জামাতা অর্থাৎ সম্পর্কে নবাব সিরাজের মামা মীর কাশিমও একই সঙ্গে তার ভাগনে অর্থাৎ নবাব সিরাজের জন্য বিপদ ডেকে আনেন।
এদিকে ঘসেটি বেগম সম্পর্কের দিক থেকে মীর কাশিমের খালাশাশুড়ি ছিলেন। মনোমালিন্য এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ায় এ খালাকে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে গোপনীয় স্থানে আত্মগোপনে যেতে হয়। কারও কারও মতে, তিনি ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে লুকিয়ে ছিলেন। পরে তাকে মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় ঢাকার মতিঝিলে মতান্তরে পশ্চিমবঙ্গের মতিঝিলে পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়। ফলে ভাগনের কারণে মৃত্যু হয় খালাশাশুড়ি ঘসেটি বেগমের।
আলীবর্দী খানের চেয়েও আরও বড় মাপের এক নেতা ছিলেন। তার ছিল চার বোন ও এক ভাই। এই ভাইবোন এবং বোনদেরই স্বামী ও সন্তানরা একটি দেশের বারোটা বাজিয়ে হয় ইহকাল না হয় দেশত্যাগ করেন। এই ভাইবোনদের সন্তানরা এবং সন্তানের পুত্র-কন্যা, জামাতা ও পুত্রবধূ একে একে খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, এমনকি চাঁদপুরের বালুচরের অঘোষিত জমিদার বনে যান। আলীবর্দী খানের বোনের জামাই মীরজাফর ও তার জামাতার মতোই বড় নেতার ভাই, বোন, বোনজামাই এবং তাদের ও সন্তানের স্বামী-স্ত্রীরা মিলে সেই খালা ও বোনঝিদের ইমেজের বারোটা বাজায়। ফলে ধসে পড়ে খালামণি ও বোনঝির সাজানো বাগান।
সেই বড় নেতাকে পিতা আর তার স্ত্রীকে মাতা রূপে ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন রাজধানীর উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার দুই ভাই। এ দুই ভাইয়ের অবাধ যাতায়াত ছিল বড় নেতার বাড়িতে। বড় নেতার কন্যা তথা খালা তখন সেই দুই ভাইয়ের বোনে পরিণত হন। আর খালার সন্তানদের কাছে তারা হয়ে ওঠেন বড় মামা ও ছোট মামা। এদের মধ্যে ছোট মামা গলায় গামছা পেঁচিয়ে ভিন্ন দল গঠন করলেও বড় মামা থেকে যান বড় নেতার এবং পরবর্তী সময়ে তার কন্যা তথা আলোচিত খালার দলে। খালা আবার মন্ত্রিত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করেন তার ভাই তথা খালার সন্তানদের বড় মামাকে। এদিকে বড় মামা যে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন, সেই একই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হয়ে গেলেন খালার একমাত্র ছেলে, যিনি আবার ভিনদেশে বসবাস করতেন। বড় মামার কাছে কী আবদার করার পরিপ্রেক্ষিতে মামা-ভাগনের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল তা জানা যায়নি, তবে মন্ত্রিত্ব চলে যায় বড় মামার। ভাগনের জন্য মামার বিপদে পড়ার এমন নজির আগে দেখেনি কেউ।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বড় মামা মুখ খুলতে শুরু করেন। আপাতত এতটুকুই বলেছেন যে, তার মন্ত্রিত্বের মেয়াদে এ উপদেষ্টা তথা তার ভাগনে তাকে কেবল দুটি উপদেশ দিয়েছিলেন। প্রথমত চীনা কোনো কোম্পানিকে বিশ্বাস করতে নেই। আর দ্বিতীয়ত আমেরিকা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য ধরে প্রস্তাব পাঠায়। অতএব সাবধান!! কিন্তু বড় মামা এরপর সাবধান না হয়ে অসাবধানতাবশত এমন কিছু বলে ফেলেন, যা তখন সবার মুখে মুখে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ভাগনের কারণেই তখন বড় মামার মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার কথা স্মরণ করে এখন মামার কারণে ভাগনে কী বিপদে পড়তে যাচ্ছেন, তা দেখার অপেক্ষায় অন্যান্য দুষ্ট ভাগনের দল।
মামা-খালার পাশাপাশি ফুপা-ফুপু ও তাদের বংশধররাও আছেন মহাবিপদে। টুঙ্গিপাড়ায় বিশেষ পরিবারের বিয়ে করে জাতীয় ফুপা বনে গিয়েছিলেন এক নেতা। স্ত্রীর মৃত্যু ও নিঃসন্তান অবস্থা তাকে সম্পদের লোভ থেকে মুক্ত রাখতে পারেনি। বরং তার ছিল শুধু ‘খামু-খামু’ ভাব। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তার বাড়িতে আগুন দেওয়া হলে বের হতে থাকে দেশ-বিদেশের পোড়া, অর্ধপোড়া ও অক্ষত টাকার বস্তা। শোনা যায়, টাকার জাজিম না হলে তিনি ঘুমাতেও পারতেন না। এই নেতার সম্পর্কে ভাগনি হন এবং বিদেশে থাকেন এমন এক পালক কন্যার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে আরেক দল। এই মামার কারণে এখন আর কোন কোন ভাগনে-ভাগনি ধরা পড়েন, তা দেখার অপেক্ষায় উৎসুক চোখ। কারণ ভোলার ডাকসাইটে এক নেতার ভাগনেও আজ গ্যাঁড়াকলে।
অন্যদিকে যারা ছিলেন বেয়াই, তাদেরও হলো না রেহাই। ফরিদপুরের জাতীয় বেয়াই এখন নাকি দুবাই। তার পুত্র নাকি জেলে, যে ছিল জাতীয় জামাই। চারদিকে তাই একই সুর—নাইরে নাই-কারোই রেহাই নাই, মামা-ভাগনে যেখানে, বিপদ নাই সেখানে, এ কথার ভিত্তি নাই। মামা-খালা যেখানে বিপদ-আপদ সেখানে—এ কথাও মানা চাই।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর। গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল : [email protected]