আমাদের দেশে বিচারপ্রাপ্তির আশায় যারা আদালতের দ্বারস্থ হন, তাদের পদে পদে দুর্ভোগ, ভোগান্তি ও হয়রানি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘকাল ধরে এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসা মানুষের কাছে যেন এক রকমের ‘নিয়তি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর নিয়তি মানেই এর ওপর মনুষ্যের নিয়ন্ত্রণহীনতা! ফলে মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। কিঞ্চিৎ ভুল হলো কি? কেননা আইন-আদালত যেহেতু মানুষের তৈরি, সেখানে ‘নিয়তি’র নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা নয়। যদি তা থাকেও, তাহলে শুধু বিচারপ্রত্যাশীদের বেলায়ই কেন তা সক্রিয়—এখানেই বোধহয় রয়েছে ফাঁকফোকর এবং জনবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার দুর্বলতা। যাই হোক বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সভ্য দুনিয়ায় এই চিত্র অত্যন্ত বেমানান।
এ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে একটি বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তারা সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে বিচারপ্রার্থীদের যে ভোগান্তি ও হয়রানির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা এক কথায় অত্যন্ত হতাশার, যার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনটি বলছে, আদালতে বিচারপ্রার্থীদের কমপক্ষে ২০ ধরনের দুর্ভোগ ও হয়রানি চিহ্নিত করেছে এ সংস্কার কমিশন। বিচারব্যবস্থার পদ্ধতিগত কারণ, আদালতের অব্যবস্থাপনা, আইনজীবী বা আইনজীবী সমিতির দ্বারা, কখনো বা আদালতের সহায়ক কর্মচারীর কারণে বিচারপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হন। এসব হয়রানি ও দুর্ভোগ লাঘবে এক ডজনের বেশি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করে। বৃহস্পতিবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হয়রানি ও দুর্ভোগ বিষয়ে সংস্কার কমিশন একটি জরিপও পরিচালনা করেছে। জরিপে মতামত প্রদানকারীর ৯০ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করে, আদালতের কর্মচারীরা হয়রানি করেন। এ ছাড়া আদালতের কার্যক্রম হয়রানিমূলক বলে মনে করেন ৭৫ শতাংশের বেশি আইনজীবী। পাশাপাশি আইনজীবীরা আদালতের সময় নষ্ট করেন মর্মে মতামত দেন ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ। ‘আদালতের ব্যবস্থাপনাজনিত ঘাটতিতে দুর্ভোগ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার আইনজীবী ও পক্ষগণ আদালতে হাজির হওয়ার পর জানতে পারেন, বিচারক ছুটিতে, আদালতের কার্যক্রম হবে না। এরূপ পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ ব্যয় এবং দুর্ভোগ হয়। আদালতগুলোয় ঐতিহ্যগতভাবে আগে কোনো দিবস উদযাপন হতো না। আদালত প্রাঙ্গণে নানাবিধ উৎসব, অনুষ্ঠানের আয়োজন আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। এগুলোর কারণে একদিকে আদালতের বিচারিক কাজ বিঘ্নিত হয়, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে বিচারকদের সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়। প্রকাশ্য আদালতে তারিখ না দেওয়া, আসামির পরিচয় যাচাইয়ের মতো প্রক্রিয়ায়ও ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হন বিচারপ্রত্যাশীরা। আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে সৃষ্ট, আইনজীবী এবং আদালতের কর্মচারী কর্তৃক হয়রানি ও দুর্ভোগের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
আমরা মনে করি, দেশে একটি হয়রানিমুক্ত, জনবান্ধব বিচারব্যবস্থা একদিন গড়ে উঠবে—এই আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন দেশের প্রত্যেক মানুষের। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারলে নিশ্চয়ই বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ লাঘব হবে। আমাদের বিশ্বাস, বিচারপ্রার্থীর সুষ্ঠু বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ-সরল ও ভোগান্তিমুক্ত করতে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হবেন এবং মানুষ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাটি অদৃষ্ট বা নিয়তির হাত থেকে মুক্ত হবে।