এটি শাশ্বত সত্য যে, ইতিহাস এমন একটি প্রপঞ্চ; যা থেমে থাকে না। একটির পর একটি সৃষ্টি ও ধারণপূর্বক চলতে থাকে। আর ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না। যে যা করবে, ঠিক ঠিক তার আমলনামায় সময়ের আবর্তে হাতে ধরিয়ে দেবে। এই সূত্র ধরে একজন মহৎ ব্যক্তিত্বের কথা মনে পড়ে। তিনি হলেন রাজনীতিবিদ এবং ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন
এটি শাশ্বত সত্য যে, ইতিহাস এমন একটি প্রপঞ্চ; যা থেমে থাকে না। একটির পর একটি সৃষ্টি ও ধারণপূর্বক চলতে থাকে। আর ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না। যে যা করবে, ঠিক ঠিক তার আমলনামায় সময়ের আবর্তে হাতে ধরিয়ে দেবে। এই সূত্র ধরে একজন মহৎ ব্যক্তিত্বের কথা মনে পড়ে। তিনি হলেন রাজনীতিবিদ এবং ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন। বলতে গেলে তিনি জীবনের প্রায় ২২টি বছর পারিবারিক জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন শুধু ভাষা ও দেশের মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য। এজন্য কত না কষ্ট করেছেন, কত না দৈহিক ও মানসিক অত্যাচারসহ অনেক সময় না খেয়ে কালাতিপাত করেছেন।
আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে আব্দুল মতিন যখন দেখলেন, বাংলা ভাষার ওপর চরম আঘাত এসেছে; তখন তিনি নিশ্চুপ না থেকে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসেন। কেননা তিনি জানতেন মানুষের যে ভাষা রক্তের সঙ্গে মিশে থাকে, সেটা হলো মাতৃভাষা (Mother Tongue)। আর মানুষ একটি ধ্রুপদি ভাষাই জানে এবং এ ভাষার সূত্র ধরে সব ইন্দ্রিয় সদা সজাগ থাকে, অন্য কোনো ভাষা নয়। এ ক্ষেত্রে কোনো বাংলাভাষী যদি ইংরেজিতে কথা বলেন ও শোনেন, তাহলে আদি বাংলা ভাষায় মনের আঙিনায় অনুবাদ করে হৃদয়ঙ্গমপূর্বক বলেন বা শুনে থাকেন। তাই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ যখন পাকিস্তানের ভাষা উর্দু বলে অভিহিত করেছিলেন, তখন প্রথম প্রতিবাদী এই মহৎ কণ্ঠ আব্দুল মতিন মেনে নেননি, তার সম্মুখেই চিৎকার করে বলেছিলেন, নো নো নো। এখানে উল্লেখ্য যে, জিন্নাহ সাহেব যখন প্রথমে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্সের বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’—তখন মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে হাত নেড়ে কিছুসংখ্যক ছাত্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তার মধ্যে আব্দুল মতিনই ছিলেন সর্বাগ্রে ও অধিক সোচ্চার। শুধু তাই নয়, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে যখন সচেষ্ট হন, তখন তার জনৈক বন্ধু জামা ধরে সজোরে বসিয়ে দেন। অবশ্য এ বিষয়টি কেউ তেমন খেয়াল করেনি। উল্লেখ্য, সভা শেষ হলে আরও সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ না করার জন্য আব্দুল মতিন তার নিজের ওপর ধিক্কার দেন এবং তিনি দৃঢ় সংকল্প নেন যে, জিন্নাহ সাহেব দ্বিতীয়বার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যদি বলেন; তাহলে কোনো অবস্থায় নিশ্চুপ থাকবেন না। তাৎক্ষণিকভাবে তার দৃঢ় প্রতিবাদ জানাবেন। তাই হাতে টাকা না থাকলেও পোশাক ও কার্ডের জন্য টাকা ধার করেন এবং ১৯৪৮ সালে ২৪ মার্চে কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আর ওই অনুষ্ঠানে যখন জিন্নাহ সাহেব দ্বিতীয়বার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন; তৎক্ষণাৎ পেছনের সারি থেকে প্রথমেই নো নো নো বলে প্রতিবাদ জানান। অবশ্য অনেকে বলেন যে, এ কে এম আহসান প্রথমে নো নো নো বলেছিলেন। কিন্তু এর সপক্ষে আরমানিটোলা হাই স্কুলের শিক্ষক কামরুদ্দিন সাহেবের কথায় উদ্ভাসিত হয় যে, প্রতিবাদ হয়েছে ঠিকই; কিন্তু কে করেছেন, তার সপক্ষে তেমন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। এদিকে সৈয়দ আলী আহসান এ ব্যাপারে বলেছেন যে, তিনি শুনেছেন, দেখেননি। তাই স্বয়ং আব্দুল মতিন মহোদয়ের সঙ্গে কয়েক দফায় আলোচনাসহ অন্যান্য তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে প্রতিভাত হয় যে, আব্দুল মতিন প্রথমে প্রতিবাদ করে নো নো নো বলেছিলেন। অবশ্য এর সপক্ষে প্রকৌশলী হাতেম আলী খানের ছেলে মি. রনো বলেন যে, ওই মুহূর্তে তার বাবা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন প্রথম নো নো নো বলেছেন আব্দুল মতিন। আর তখন থেকেই পোলারাইজেশন শুরু হয়। এটা থেকে ভাষা আন্দোলন ঘনীভূত হতে থাকে এবং সৃষ্টি হয় মহান ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস।
এখানেই থেমে থাকেনি। মেরূকরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত এগিয়ে দেয় একাত্তরের স্বাধীনতা। এ ক্ষেত্রে এক ইংরেজ সাংবাদিক বলেছিলেন, 21st Martyr day is such altar-stem which paved the way for freedom of Bangladesh at the cost of blood of about 3.00 million people & chastity of uncountable women. তাই তার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে এতটুকু দ্বিধা নেই মহাপ্রাণ আব্দুল মতিনের ‘নো’ থেকে পরোক্ষভাবে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে আজ বাংলাদেশ। হয়তো অনেক সম্মানিত পাঠকবর্গ অন্যভাবে চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু যদি একটু চোখ বুজে সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন কথাটি ধ্রুবতারার মতো মনের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠবে। তখন আর দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। অবশ্য ভাষা আন্দোলনে অনেকেরই জীবন উৎসর্গসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তাদের আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তবে এ ক্ষেত্রে জোর গলায় বলতে চাই, প্রথমে যিনি এ মেরূকরণের সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন সংগ্রামী কণ্ঠস্বর আব্দুল মতিন।
উল্লেখ্য, তৎকালীন বাঙালিদের প্রাণের ভাষা জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ভাষাসংগ্রাম নিয়ে দুটি পরিষদ গঠিত হয়। একটি হলো সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যাতে ২৮ জন সদস্য ছিলেন এবং যার মধ্যে আব্দুল মতিন ছিলেন অন্যতম। আরেকটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রাম কমিটি, যার আহ্বায়ক ছিলেন স্বয়ং আব্দুল মতিন। ৫২-এর ২১ তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবে বলে ওইদিন সারা প্রদেশে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। এদিকে রমনা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার ইস্যু ছিল ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি হবে না? উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ১১ জন না ভাঙার বিপক্ষে মত প্রকাশ করলেন। চারজন ভাঙার পক্ষে ছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল মতিন ছিলেন অন্যতম। তা ছাড়া তিনি যখন দেখলেন, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক বিষয়টি এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না; তখন বলতে গেলে নিজে ঝুঁকি নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে তিনিই টেনে আনলেন। এ সূত্র ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে তারই জোরালো বক্তৃতার পথ বেয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ১০ জনের ছোট ছোট মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে এবং বাস্তবে সেটাই হয়।
পরবর্তীতে আব্দুল মতিন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন এবং অশেষ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কেননা পাকিস্তানি বাহিনী তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। বাবা আব্দুল জলিল ও ছোট ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাবনা জেলার নগরবাড়ি ঘাটে ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধে তার সক্রিয় ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। এতদ্ব্যতীত পরবর্তীকালে কমিউনিজমের ভাবধারায় আদি-শিকড় কৃষকদের নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে কম নাজেহাল হতে হয়নি। আসলে আব্দুল মতিন মাটি, মানুষ ও মাতৃভাষার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। ফলে তার নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছু নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের স্ত্রী বড় মগবাজারে কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় এক বছর ধরে প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাগত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। অথচ কেউ তার তেমন খবর রাখেন না। বস্তুত বিধাতার আজব ও রহস্যপূর্ণ খেলা বোঝা বড় দায়!
লেখক: অর্থনীতিবিদ