কয়েক বছর ধরেই দেশে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ভুগছে তারল্য সংকটে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেই এর পরিমাণ এক লাফে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা বেড়ে পৌনে ৩ লাখে গিয়ে ঠেকে। এ সময় দেশের কার্যরত ৬১ ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টিতেই বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ডিসেম্বরের খেলাপি ঋণের হিসাব এখনো প্রাক্কলন করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এ সময় খেলাপি ঋণ সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এটি দেশের প্রায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান তো বটেই, সার্বিকভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত অশুভ সংকেত।
রোববার কালবেলায় প্রকাশিত ‘খেলাপি বেড়েছে ৪৮ ব্যাংকে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, ব্যাংক থেকে একটি গোষ্ঠীর লুটপাটের তথ্য আওয়ামী শাসনামলের ১৬ বছরে আড়াল করে রাখা হয়। নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ অনেক আগেই খেলাপি হয়ে পড়ে। তবে সরকার-ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী গুটিকয়েক ব্যবসায়ী প্রভাব খাটিয়ে এসব ঋণখেলাপি করতে দেননি। যার প্রভাব গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেই দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতাসীন হয় তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এখন ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয়বার ক্ষমতা নেওয়ার সময়ও খেলাপি ঋণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা হয়। তৃতীয় দফায় ক্ষমতা নেওয়ার সময় ২০১৮ সালের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। গত বছর জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ওই সময় মোট বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। গত বছর মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে কেন বের হতে পারেনি—এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু স্পষ্ট হয়েছে বিগত সরকারের পতনের পর। মূলত তাদের ব্যাংক দুর্নীতি, অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ শিথিলতাসহ বহুভাবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণহীন জায়গায় পৌঁছে। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া। সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকগুলোয় একই চিত্র। খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চিত্র দেশের ব্যাংক খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। ঋণ যেন কুঋণে পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর যতটুকু সতর্ক ও সজাগ থাকার কথা, তাতেও ছিল যথেষ্ট ঘাটতি। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে কমতি ছিল না; কিন্তু কাজের কাজ তখন কী হয়েছে, এটি এখন আর প্রশ্নের বিষয় নয়।
আমরা জানি, বিগত সরকারের সময় দুর্নীতি, অনিয়ম, পাচারসহ নানামুখী অপকর্মের মাধ্যমে দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। এ নিয়ে তাদের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত যা যা নেওয়া হয়েছে, তা হয়তো ধীরে ধীরে কাজ করছে। এই মুহূর্তে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় তৎপরতা জরুরি। এজন্য সবার আগে জনগণের গচ্ছিত আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংক খাতের ওপর বিশেষভাবে নজর দেওয়ার বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্টরা খেলাপি ঋণ আদায়ে দ্রুত সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন—এটা আমাদের বিশ্বাস।