শুরুতেই একটা কৈফিয়ত দিতে চাই। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে দেশের একঝাঁক বীর সন্তানের অতুলনীয় ভূমিকা। তাদের মধ্য থেকে একজনই নিঃসন্দেহে বছরের আলোচিত চরিত্র। এর বাইরে কিছু চিন্তা করাও ধৃষ্টতা বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তবে আমার সিরিয়াস লেখার চেয়েও রম্য লেখার পাঠক বেশি হওয়ায় তাদের প্রতি বছর শেষে সম্মান প্রদর্শন করেই আসল বাদ দিয়ে বছরের ডামি চরিত্র নিয়েই লেখার এই প্রচেষ্টা। আশা করি, বিষয়টির ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা হবে না।
আসলে বছরটি শুরুই হয়েছিল ‘ডামি’ নামের এক ডামাডোল পেটানো শব্দ নিয়ে। এই ‘ডামি’ই শেষ বিচারে দামি গণতন্ত্রকে হত্যা করে রক্তাক্ত করে বাংলার জমিন। ডামি শব্দের অর্থ বিকল্প, সাজানো, নকল ইত্যাদি। বছর শুরুতে নির্বাচন করার ঘোষণা এলেও নির্বাচনে একটি বড় দলই কেবল কোমর বেঁধে নামল।
সঙ্গে জোট নামের ভজঘটে জুটল খয়রাত খাওয়া কিছু ঝুট বা মিছেমিছি দল। আর জব্বর একখানা বিরোধী দল ‘আরেকবার সাধিলে খাইব—আরেকটু দিলে যাইব’ পদ্ধতি অবলম্বন করে শেষতক নির্বাচনে গেল। তবে ততদিনে নির্লজ্জ খেতাবপ্রাপ্ত এই বিরোধী দলটি লজ্জা নিবারণের শেষ নেংটিটুকু হারিয়ে ফেলায় কোমর বাঁধার মতো কোনো কাপড়ও খুঁজে পেল না। ফলে কোমর না বেঁধেই তারা মাঠে নামে এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে একেকজন একেক বক্তব্য দিতে থাকে।
এরপর আসে ‘আবদার অব দ্য ইয়ার’। এই তথাকথিত ডামি বিরোধী দল আবদার করল যে, যদিও তারা মূল দলের জোটে নেই, তবে তারা মূল দলের আশীর্বাদপ্রাপ্ত যে কয়েকটি আসনে নির্বাচন করবে, সেসব আসনে মূলদলের অন্যরা যেন নির্বাচন না করে। কে এই অন্যরা—এমন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল ডামি নামক মহাদামি এক শব্দে।
মূল দল তাদের দলের সম্ভাব্য কয়েক হাজার প্রার্থীর কাছে নগদ টাকার বিনিময়ে নমিনেশন পেপার বিক্রি করে। কারও কারও কাছ থেকে দলের নির্বাচন পরিচালনা তহবিল এবং অন্যান্য তহবিলে অনুদানও নেয়। পর্দার অন্তরালে একাধিক লবিং গ্রুপ ও প্রভাবশালী নেতা দেশ-বিদেশ থেকে মনোনয়ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কথা বলেও আখের গোছায়। তারপর নির্লজ্জ বিরোধী দলের হাতেগোনা কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে মনোনয়ন দেয় এবং সেসব আসনে মনোনয়ন দেওয়া নিজ দলের প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখে। এতকিছুর পর যখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দেখা মিলবে না তখন ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বড় দল তাদের সব নেতাকর্মীদের ফ্রি স্টাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী রূপে ভোটে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ৩০০ আসনে এমন সহস্রাধিক প্রার্থী মূল দল বা নির্লজ্জ বিরোধী দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘কথিত ভোটে’ অবতীর্ণ হয়। তাতে কেউ হারে কেউ জেতে। কিন্তু হার-জিত যার যার ডামি কিংবা ডামি প্রার্থী তকমা জোটে সবার এবং নির্বাচনটাই হয়ে যায় ডামি নির্বাচন। তখন থেকে মনে হচ্ছিল বছরের আলোচিত শব্দ হবে ডামি আর আলোচিত চরিত্র হবে ডামি প্রার্থী। কিন্তু না, বছরের আলোচিত শব্দটি আর ‘ডামি’-এর মাঝে আবদ্ধ থাকল না জিম্মি।
এই ফাঁকে একটু বলে রাখি, পৃথিবীজুড়ে বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও সংগঠন বছর শেষে একটি আলোচিত নাম, আলোচিত চরিত্র, আলোচিত শব্দ, আলোচিত বাক্য ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করে। নানা প্রকার প্রচার জরিপ, গবেষণা, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উঠে আসে এসব আলোচিত নাম, চরিত্র, শব্দ বা বাক্য। আমাদের দেশেও এই চর্চা একসময় চোখে পড়েছিল। কিন্তু তথাকথিত মিডিয়া সংক্রমণে কয়েক বছর থেকে দেখা যায়, বছর শেষে তারা কেবল সরকার ও ব্যক্তি বিশেষের অর্জন নিয়ে বন্দনা করছেন এবং সেই সরকার ও ব্যক্তি ক্ষমতায় থাকলে আগামীতে বাংলাদেশ উন্নতির কোন শিখরে পৌঁছবে এবং সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়াকে টেক্কা দিয়ে সুইজারল্যান্ড হয়ে যেতে কয় সেকেন্ড বাকি আছে, তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যস্ত থাকতেন।
মনে পড়ে করোনা আতঙ্কে বিশ্ব যখন অচল, তখন এক মন্ত্রী বলেছিলেন আমাদের নেত্রী করোনার চেয়েও শক্তিশালী। ছাব্বিশের সহিংসতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায় তার একটি কথায়, তা হলো ‘এ আত্মস্বীকৃত রাজাকার, যারা নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতার প্রমাণ ঘটিয়েছে গত রাতে, তার জবাব তারাই (ছাত্রলীগ) দেবে’। আরেক মন্ত্রী একসময় বাংলাদেশের মানুষ জান্নাতে বা বেহেশতে আছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তার এলাকার অসংখ্য মানুষ প্রবাসে থাকলেও তিনি বলেছিলেন প্রবাসীরা বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দরে নেমেই নবাবজাদা বনে যান। ফেরাউনের আমলে আমলাতন্ত্র ছিল বলে মিডিয়া আর সচিবালয় গরম করেছিলেন সাবেক আমলা এক মন্ত্রী। আবার আরেক মন্ত্রী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে করা সিন্ডিকেটকে কিছু করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেছিলেন; কিন্তু এসবের কিছুই কখনো বছরের আলোচিত কোনো বিষয় হতে পারে বলে কোনো মিডিয়ার মনে হয়নি।
তবে এখনকার চিত্র ভিন্ন। যারা পাওয়ার আশায় অথবা পেয়ে হারানোর ভয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণেরও ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজের কলমে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ নামক কালি ভরেছিলেন, তারাও এখন যারপরনাই সোচ্চার। ফলে চব্বিশের বিপ্লবের আগের ও পরের এমন কিছু শব্দ, বাক্য বা চরিত্র, যা বছরজুড়েই ভাইরাল ছিল এবং যত্রতত্র আলোচিত হচ্ছিল, তা নিয়েই এবারের আয়োজন। হয়তো কারও জন্য এই শব্দ, বাক্য বা নামগুলো আনন্দের; আবার কারও জন্য নীরব রক্তক্ষরণের বিষয়।
অনেকের মূল্যায়নেই এ বছরের আলোচিত ডামি চরিত্রের তালিকায় থাকবেন ‘আপা’। ভোটকেন্দ্র ফাঁকা থাকলেও তথাকথিত ভোটে আপা ও আপার দল যেমন একচেটিয়া ভোট পেত, এখন আলোচিত ডামি চরিত্রের জন্য প্রকৃত ভোট হলে উচ্চ বংশীয় ছাগল, রাজাকারের বাচ্চা, গণভবনের সাংবাদিক, টাকা পাচারকারী বণিক, তথাকথিত—ফাটা বিচারক, কোটি টাকার পিয়ন, আশুলিয়ার পুলিশ; ইত্যাদি ঐতিহাসিক চরিত্রকে পাস কাটিয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে যাবেন আপা। আর আলোচিত বাক্য হবে ‘আপা কখনো পালায় না’।
আপা ছিলেন আবার দুজন। বড় আপা আর ছোট আপা। একেক সময় তাদের একেকজনের কথা বলে ধান্দাবাজরা ছাড়ত চাপা। এই চাপায় যে বিশ্বাস করত, তাদের অবস্থা হতো ফাঁপা। মিডিয়ায় তাদের কান্না দেখানো হতো চাপা। তাদের পকেটে থাকত বিরোধী দল জাপা। বেঁচে থাকাটা ছিল গোয়েন্দাদের কৃপা। আলু-পেঁয়াজ দামের ক্ষেত্রে যেন সোনা-রুপা। সব দেখে মানুষ হলো ক্ষ্যাপা। এই দেখে ‘পালায় না’ বলেও পালিয়ে গেলেন আপা। দলের কলঙ্ক ধোয়ার জন্য পাওয়া যাচ্ছে না কোনো ধোপা।
বীরত্বের কারণে কোনো নেতা বা সেনাপতির নামের আগে কোনো শক্তিশালী পশুর নাম খেতাব হিসেবে যুক্ত করা নতুন কিছু নয়। প্রায় ১৪০০ বছর আগে মুসলমান সেনাপতি হিসেবে বীরের মতো লড়াই করে হজরত আলী (রা.) আসাদ উল্লাহ বা আল্লাহর সিংহ খেতাব পেয়েছিলেন। ভারতের মহিশুরের টিপু সুলতান ও সুরি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সার সুরির নামের আগে শের (বাঘ) উপাধি থাকত। আমাদের একজন শেরেবাংলা বা বাংলার বাঘ উপাধি পাওয়া রাজনীতিবিদ ছিলেন, নাম শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কোকিল পাখির মিষ্টি গলার কারণে অনেক সংগীত শিল্পীর নামের আগেও কোকিল উপাধি জুড়ে দিয়েছে সংগীত অনুরাগীরা। তবে এর বাইরে নামের আগে একটি কর্কশ গলা, কুৎসিত রং সর্বোপরি পচা, গলা ও নোংরা আবর্জনা খাওয়া পাখি তথা কাউয়া (কাক) খেতাব পাওয়া একমাত্র নেতা জুটেছে এই জাতির ভাগ্যে। চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি কথা বলতেন বিচিত্র ঢঙে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তিনি ঢুকে গেলেন টঙ্গে, (ছোট দোকানে)। আর দেখা মিলল না এই বঙ্গে। ভক্তদের ভারে একদা মঞ্চ ভাঙলেও এখন কেউ নেই তার সঙ্গে। বছরের আলোচিত ডামি চরিত্রে তিনিও তাই শৃঙ্গে।
আরও আছেন এক বিচারক, তিনিই তার পরিমাপক (তুলনা)। এক উপস্থাপিকাকে বললেন রাজাকারের বাচ্চা। বুঝিয়ে দিলেন পাগল তিনি একদম সাচ্চা। বিপ্লবের পর লুকিয়ে গেলেন যেমন দুধে লুকায় লাচ্চা (সেমাই)। সিলেট সীমান্তের জঙ্গলে, খেলেন ধরা অমঙ্গলে। কলাপাতায় শুয়ে শুয়ে দুখের কথা বলেন গেলে। কেউ শুনল না তার আর্জি, গেলেন তিনি জেলে। হঠাৎ হলেন শিরোনাম, তার বিশেষ অঙ্গ নাকি গেছে গলে! কে করল এই আকাম, হিসাব না মিলে। হতে চাইলে ডামি আলোচিত চরিত্র, বাদ দেই তাকে কী বলে?
আরও একজন ছিল দেশে, চালাত সে বিশেষ দল। সবাই জানত তার যে ছিল, আজব এক ভাতের হোটেল। শিশু-বৃদ্ধ-শিল্পী-বণিক, ভক্ত তার ছিল অনেক। কপাল তার মন্দ, ছাত্রদের সঙ্গে লাগল দ্বন্দ্ব। ভাতের হোটেল হলো বন্ধ। কোথায় যেন পালিয়ে গেলেন ছিঁড়ে সব সম্বন্ধ। বিপ্লবের শুরুতেই সরে গেল, যারা ছিল তার বন্ধু। যেন তার গায়ে নর্দমার গন্ধ। নিয়তির এই বিধান যে বুঝে না, চোখ থাকতে সে অন্ধ। বছরের ডামি চরিত্র নিয়ে এবারের আলাপ এখানেই বন্ধ।
প্রিয় পাঠক, আলোচিত চরিত্র ছাড়াও আলোচিত রম্য শব্দ, বিষয় বা বাক্য কী হতে পারে, ইমেইল করে তা জানাবেন। এ নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে। উদাহরণ পদত্যাগ, পদত্যাগপত্র, পালায় না, একটাই মরে—গুলি শেষ হবে না, গরম জল, আমার কী অপরাধ, মুরুব্বি মুরুব্বি উহু হু হু—ইত্যাদি।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর। গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ই-মেইল: [email protected]