দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি যখনই স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছিল, তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্ক। এতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ঘিরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কের প্রথম আঘাত আসবে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতে। কারণ, সবশেষ অর্থবছরেও মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ১৮ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাক খাত ক্ষতির মুখে পড়লে এ খাত ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানও পড়বে হুমকির মুখে। এ ছাড়া পোশাক শিল্পে কাজ করা প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত শুল্কারোপের কারণে চীনা কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের এসব চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের সার্বিক রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি তৈরি হতে পারে। সব মিলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অশনিসংকেত দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলারের পণ্য, যার বেশিরভাগই তৈরি পোশাক। বিদায়ী বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৩৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের ওপর উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছেন। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কহার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ ধার্য করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালনায় সহায়ক কমিটির সদস্য ও শাশা গার্মেন্টসের এমডি শামস মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত শুল্ক বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করেছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে তার প্রতিযোগীদের তুলনায় উচ্চ শুল্ক কাঠামোর সম্মুখীন হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির জন্য চীন থেকে বাংলাদেশে শিল্প স্থানান্তরের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কারণ, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি খরচ এখন চীনের তুলনায় বেশি হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কর আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের যে মৌলিক সমস্যা ছিল, যা মূলত আমদানি থেকে সংগ্রহ করা হয়, তা এখন আরও বেশি আলোচিত হচ্ছে। কারণ, আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমদানি শুল্ক হ্রাস বা মওকুফ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ যখন একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে এই উত্তরণ মসৃণ হবে না, যা উত্তরণের পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন তৈরি করে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক সামষ্টিক স্থিতিশীলতা চাপের মুখে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তিন নম্বর অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকা চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ার শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হবে, সে কারণে হয়তো তৈরি পোশাক শিল্প অতটা আক্রান্ত হবে না—এমন ধারণা কেউ কেউ করছেন। তবে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশ তুরস্কের ওপর ১০ শতাংশ, ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ওপর ৩০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ওপর ৪৪ শতাংশ ও কম্বোডিয়ার ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আর তুরস্ক, হুন্ডুরাস, ভারত ও পাকিস্তানের ওপর শুল্ক বাংলাদেশের তুলনায় কম হওয়ায় লাভবান হবে এসব দেশ। তবে পাল্টা শুল্কে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কতটা নেতিবাচক পড়বে, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার নন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, নতুন করে শুল্ক আরোপে কম বা বেশি প্রভাব পড়বে। তার বড় কারণ হলো, শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। এর ফলে পণ্যের চাহিদা কমবে। এসব প্রভাব পর্যালোচনার পর যত দ্রুত সম্ভব সরকারি পর্যায়ে শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে শুল্কের চাপ কমাতে হবে। না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়বে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা ৭ হাজার ৯২৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই বাজারে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৃতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। গত বছর (২০২৪ সাল) বাংলাদেশ ৭৩৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। গত বছর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রতি বর্গমিটার পোশাকের দাম ছিল ৩ দশমিক ১০ ডলার। আর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করে যা পাওয়া যায়, তার শতাংশ ধরে ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর হার হয় ৭৪ শতাংশ। এর অর্ধেক বা ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে বাংলাদেশের পণ্যে।
জানতে চাইলে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালবেলাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তবে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো। যেহেতু খুব বেশি পণ্য দেশটি থেকে আসে না, সেহেতু খুব বেশি ক্ষতি হবে না। বরং শুল্ক কমলে তৈরি পোশাকসহ অন্য পণ্যের রপ্তানি বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করে পোশাক তৈরি করছি আমরা। সেই পোশাকের বড় অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য তাদের দেশে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের পদক্ষেপ নিতে পারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৯১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে ২৯ কোটি ডলার। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য রয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের। সেই হিসাবে এনবিআরের হিসাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আমদানি হওয়া ২৬২ কোটি ডলারের পণ্যের মধ্যে ১৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয়নি। যেমন গম, তুলার মতো পণ্যে শুল্ক-কর নেই। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে গড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কাস্টম শুল্ক-কর আদায় করেছে ১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ।
জানতে চাইলে ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল কালবেলাকে বলেন, শুধু বাংলাদেশই আক্রান্ত হচ্ছে না। প্রায় ৬০ দেশে এর প্রভাব পড়বে। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপরও শুল্ক বেড়েছে। যেমন—চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ৩২ শতাংশ ও ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক বসবে। নিঃসন্দেহে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে। দক্ষিণ আমেরিকার হন্ডুরাসের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বাড়তে পারে বলেও মনে করেন তিনি। শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত, যাতে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারি। আমাদের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে বানানো বড় কেনা ব্র্যান্ডের শার্ট যুক্তরাষ্ট্রের দোকানে এতদিন ২০ ডলারে বিক্রি হতো। সেই ব্র্যান্ড হয়তো বাংলাদেশের গার্মেন্টস কোম্পানি থেকে সেই শার্ট কিনছে পাঁচ ডলার দামে। শুল্কের হিসাবের ফাঁকটা হলো, শুল্ক আরোপ হয় সাধারণত ক্রয়মূল্যের ওপর। সেই হিসাবে পাঁচ ডলারের শার্টের ওপর আগে শুল্ক আসত ৭৫ সেন্ট, এখন আসবে ২ ডলার ৬০ সেন্ট। আগের চেয়ে বেশি দিতে হবে ১ ডলার ৮৫ সেন্ট। ফলে ২০ ডলারের ওই শার্টের দাম প্রায় দুই ডলার বাড়িয়ে সেই ব্র্যান্ড অনেকটাই সামাল দিতে পারবে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো—বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কমদামের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। তবে বাংলাদেশের উচিত মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমানোর জন্য আলোচনা শুরু করা বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হতে পারে ১৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে গতকাল বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করায় আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা আসবে। সবকিছুর দাম বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে জানান তিনি। কারণ অন্যান্য দেশের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, এমনকি কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, কোনো বাড়তি সুবিধা পাবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, যেমন ওষুধ, লো প্রাইস (কমমূল্য) এবং এসেনসিয়াল আইটেম (নিত্যপ্রয়োজনীয়)। চীনও এই ছাড় পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এ তালিকায় নেই। বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে, দেশটি কম দামের পোশাকসহ এসেনসিয়াল পণ্য রপ্তানি করে। এ কারণে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ের দাবি করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুল্ককর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আনা হলে সহজভাবে আমদানি বাড়বে। কারণ, মার্কিন উদ্যোক্তারা নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করবেন।
তিনি আরও বলেন, শুল্ক আরোপের পর সব দেশই নানামুখী নীতি নিচ্ছে। কেউ শূন্য শুল্কের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কেউ পাল্টা শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে অন্য কোনো সুযোগ নেই। আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করি, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের জন্য। আবার তাদের তুলা ব্যবহার করছি। বিষয়টি যদি আমরা যুক্তি দিয়ে দাঁড় করাতে পারি এবং যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে সরকার।
আলোচনায় শুল্ক ইস্যুর সমাধান দেখছেন প্রধান উপদেষ্টা: যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। যেহেতু এটি আলোচনাযোগ্য, তাই আমরা আলোচনা করব এবং আমি নিশ্চিত যে, আমরা সর্বোত্তম সমাধানে পৌঁছতে পারব।’ বৃহস্পতিবার ব্যাংককে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম অধ্যাপক ইউনূসের বরাত দিয়ে এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘এখনো পুরো বিষয়টি আলোচনা শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। আমরা এটা পর্যালোচনা করছি এবং আমরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, তাতে আশাবাদী সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। আমরা এমন একটা সমাধানের দিকে যেতে পারব, যাতে উভয় পক্ষের জন্য উইন উইন সিচুয়েশন হয়।’
মন্তব্য করুন