পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রাসায়নিক খাতের কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক হিসাবের বিভিন্ন বিষয়ে অসংগতি ও গোঁজামিল পাওয়া গেছে। কোম্পানিটির ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো আয়, ব্যয়, মজুত পণ্য, সম্পদ, গ্রাহকের কাছে পাওয়া, স্থায়ী সম্পদ, কর প্রদান, অবণ্টিত লভ্যাংশ, ব্যাংক হিসাবসহ আরও অনেক বিষয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। কোম্পানিটির এ আর্থিক প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে প্রায় ১৩৬ কোটি টাকার হিসাব গোঁজামিল রয়েছে বলে এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটির দাখিল করা আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত আয়, ব্যয়, গ্রাহকের কাছে পাওনা, স্থায়ী সম্পদ, অবণ্টিত লভ্যাংশ, ট্যাক্স প্রদান, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, ডেফার্ড ট্যাক্সসহ আরও অনেক বিষয়ের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ ওষুধ কোম্পানি বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বর্তমানে আর্থিকভাবে পঙ্গু হতে বসেছে।
জানা গেছে, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে ২০০৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৯৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয়কর দাবি করে ২০২২ সালের ১৫ মার্চ চিঠি দিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু কোম্পানিটি এর বিপরীতে মাত্র ২৮ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রভিশনিং করেছে। আর বাকি ৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিপরীতে কোনো প্রভিশনিং করেনি। এর মাধ্যমে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদ বেশি দেখিয়ে আসছে।
কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে জনতা ব্যাংক থেকে ২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালের জুনের আগে থেকেই আর্থিক প্রতিবেদনে ঋণের এই পরিমাণ উল্লেখ করে আসছে কোম্পানিটি। কয়েক বছরেও ঋণের পরিমাণগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিষয়টি জানতে চেয়ে নিরীক্ষকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলেও ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আবার কোম্পানি কর্তৃপক্ষও ঋণের বিষয়ে যথাযথ তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো কিস্তিও পরিশোধ করা হয়নি আবার সুদের বিপরীতে কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতিও রাখা হয়নি। ফলে কোম্পানিটির ঋণ-সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মতামত দিয়েছে।
জানা যায়, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস তার গ্রাহকদের কাছে ৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পাওনা বলে আর্থিক হিসাবে দেখিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি দিতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই অর্থ দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসা হচ্ছে, যা আদায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রভিশনিং গঠন করেনি। এর মাধ্যমে সম্পদ বেশি দেখানো হচ্ছে।
এদিকে স্পেয়ার পার্টস অ্যান্ড সাপ্লাইস হিসেবে দেখানো ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বিপরীতেও কোনো প্রমাণাদি পাননি নিরীক্ষক, যা সম্পদ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসা হচ্ছে। তবে ওই সম্পদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রভিশনিং গঠন করেনি। এর মাধ্যমেও সম্পদ বেশি দেখানো হচ্ছে। এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ লেনদেন নগদে করে। ফলে ওই লেনদেনের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নগদ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যয়-কম বা বেশি দেখানো যায়। এ ছাড়া আয়ও বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো যায় বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক, যা হরহামেশাই করা হয়।
কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে অগ্রিম প্রদান হিসেবে ২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর প্রদান করেছে। তবে এর বিপরীতে কোনো প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস। এ ছাড়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) মতো প্রতিষ্ঠানের ফি জমা দেয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানিটিতে এখনো আইপিও আবেদনকারীদের ৬০ লাখ টাকা পড়ে রয়েছে। আইপিওতে আবেদন করে শেয়ার না পাওয়া সত্ত্বেও ওই টাকা কোম্পানিতে রয়ে গেছে। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে ৯ লাখ টাকার অবণ্টিত লভ্যাংশ রয়েছে। কিন্তু এ অর্থ বিএসইসির ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে স্থানান্তর করেনি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস।
উদ্যোক্তা পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণে আইন লঙ্ঘন নিয়ম অনুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মোট শেয়ারের ৩০ শতাংশ ধারণ করতে হবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের। কিন্তু সেন্ট্রাল ফামাসিউটিক্যালসের উদ্যোক্তা পরিচালকরা তা ধারণে নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন। জানুয়ারি শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকরা শেয়ার ধারণ করছেন মাত্র ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর বেশিরভাগ শেয়ার ধারণ করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ফলে কোম্পানিটির ব্যবসায় ঝুঁকির সম্ভাবনা বেশি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যখন কোনো কোম্পানিতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণের পরিমাণ কমে যায়, তখন তারা ওই কোম্পানির ব্যবসায় মনোযোগ দেন না। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই কোম্পানির শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০১১ সালে এই নিয়ম জারি করে। এর মাধ্যমে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের দায়িত্বশীল করাই উদ্দেশ্য। পুঁজিবাজারে পতনের আগে অনেক পরিচালক তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সচিব মো. তাজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। এ ব্যাপারে সব নিরীক্ষক বলতে পারবেন যিনি এমন রিপোর্ট দিয়েছেন। কারণ, আমাদের দিক থেকে এমন কোনো তথ্য নেই যেসব তিনি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। এর বেশি আমার কিছু বলার নেই।
কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থা
সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস ২০১৩ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা আর পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। কোম্পানিটির ১১ কোটি ৯৮ লাখ ৮৪৪টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১০ দশমিক ৫১ শতাংশ আর বাকি ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ার জেড ক্যাটেগরিতে বা জাঙ্ক ক্যাটেগরিতে লেনদেন হচ্ছে।
সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস সবশেষ ২০১৯ সালে বিনিয়োগকারীদের ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। এরপর থেকে ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।
২০২৪ হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-ডিসেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি ১৪ পয়সা লোকসান হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই লোকসান ছিল ৯ পয়সা। অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিক মিলিয়ে বা ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার প্রতি ১৬ পয়সা লোকসান হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ১৫ পয়সা লোকসান হয়েছিল। গত বছর শেষে কোম্পানির শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ৬ টাকা ৮৯ পয়সা।
মন্তব্য করুন