রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী শক্তির অন্যতম নেতা হিসেবে তার উপস্থিতি সরব। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিএনপির প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন কালবেলার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত রূপান্তর।
কালবেলা: অন্তর্বর্তী সরকারের সাড়ে তিন মাস কীভাবে মূল্যায়ন করছে বিএনপি?
রুহুল কবির রিজভী : অন্তর্বর্তী সরকারের দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা কম। তবে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞ হয়ে উঠছে। আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও তারা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে। তিন মাসে একটা সরকারে মূল্যায়ন করা যায় না। সার্বিকভাবে বলা যায়, বড় ধরনের কোনো নৈরাজ্য হয়নি। সরকারের অনৈতিক কিছু দেখা যায়নি। তবে তাদের প্রচেষ্টা আরও বেশি হলে খাদ্যপণ্যের মূল্য আরও কমানো যেত। আমরা দেখেছি আমদানি-রপ্তানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ তারা নিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো তেমন সুফল দেয়নি। ১৫-১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল তিন মাসে ঠিক করা যাবে না। তার রেশ থাকবেই। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে জনগণ এর ফল দেখতে পারবে।
কালবেলা : বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। সংস্কার ছাড়াই কি নির্বাচন চায় বিএনপি?
রুহুল কবির রিজভী : আমরা বারবার বলে আসছি, আমরা সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে চাই। সরকার সংস্কারের কথা বলছে। তবে সরকারের অংশীজন এবং দেশের মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে সংস্কার শেষ করে সরকারের কাছে নির্বাচন চায়। সংস্কার গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু গণতন্ত্রের বড় একটি উপাদান নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা না বলে বরং সেটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তখন সন্দেহ তৈরি হয় সরকারের উদ্যোগের প্রতি। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও জরুরি সংস্কার একসঙ্গে চলতে পারে। সংস্কারের জন্য আমরা ৩১ দফা দিয়েছি। বিএনপিও সংস্কার চায়। তবে সেটা যেন খুব ধীরগতিতে না হয়।
কালবেলা : সরকারের সঙ্গে কি বিএনপির দূরত্ব বাড়ছে? বিভিন্ন সময় দেখছি বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করছে...
রুহুল কবির রিজভী : অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনো দূরত্ব বাড়ছে না। আমরা ১৫-১৬ বছর লড়াই করেছি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। আলোচনা, বিতর্কের মধ্য দিয়েই আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকবে। সরকারের সমালোচনা মানেই বিরোধিতা নয়। বরং নির্বাচন বা রাষ্ট্রের স্বার্থে বিতর্ক সুস্থচর্চা। এ পরিবেশ জাতির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। আমাদের আলোচনাগুলো শুনে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারছে। নতুনভাবে চিন্তা করতে পারছে। সরকার যা বলবে, যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই সঠিক, সেটা কোনো গণতন্ত্র নয়। গণতান্ত্রিক রীতিতে আমরা আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক অব্যাহত রাখব। তাহলেই আসল বিষয়গুলো বেরিয়ে আসবে। সমাজে ভিন্নমতের সুযোগ না থাকলে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে। যখন দেখছি, সরকারের কোনো বক্তব্যে সমাজ, রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, তখন আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
কালবেলা : আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে?
রুহুল কবির রিজভী : যারা অপরাধী তাদের বিচার হতে হবে। যারা এতগুলো শিশু, ছাত্রকে হত্যা করল; তাদের বিচার হবে না? তারা নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাবে? আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার নির্দেশে কাজগুলো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা শেখ হাসিনার শাসনকে মজবুত করার জন্য কাজ করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের ব্যাপারে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সব রাজনৈতিক দল, আন্দোলনকারী, নীতিনির্ধারক ও দেশের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জার্মানির নাৎসি পার্টিসহ পৃথিবীর কোনো ফ্যাসিবাদ সংগঠনই ফিরতে পারেনি। জনগণই ঠিক করবে, আওয়ামী লীগ রাজনীতি করবে কি না বা তাদের কতটুকু গ্রহণ করবে।
কালবেলা : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সমালোচনা করছে বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মী। তাদের সঙ্গে কি কোনো বিরোধ চলছে?
রুহুল কবির রিজভী : আমি মনে করি, যদি এরকম হয় তবে খুবই উপযুক্ত কাজ হচ্ছে। এটাই তো গণতন্ত্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি যদি থাকে বা তাদের আরও কোনো করণীয় থাকে, সেটা নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে। এটাকে সিরিয়াসভাবে নেওয়ার কিছু নেই। বরং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা তারুণ্যের শক্তি সেটার জবাব দেবে। এ বিতর্কের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করবে। নির্ভয়ে যখন সবাই কথা বলতে পারে, জনগণই তখন দেশের মালিক হয়ে যায়। নীতিনির্ধারকরা তখন জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কালবেলা : দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোট বিএনপি-জামায়াত দূরত্ব বাড়ছে কি?
রুহুল কবির রিজভী : বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব বা নৈকট্য কোনো বিষয় নয়। জামায়াত ও বিএনপি দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দল। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট হয়েছিল। নির্বাচনের পর সব দল নিজেদের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে। নিজের মত নিয়ে চলে। জামায়াতের কোনো বক্তব্য/কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা বা বিএনপির নীতিবিরুদ্ধ হলে আমরা তার কঠোর সমালোচনা করি। তারাও বিএনপির সমালোচনা করে।
কালবেলা : আগামীতে বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে?
রুহুল কবির রিজভী : আগামীতে বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে, তার কিছুটা স্বরূপ এখনই আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। বিএনপির নামে কেউ দখলদারি, চাঁদাবাজি করলে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেও কোনো অনৈতিক-বেআইনি কাজকে প্রশ্রয় দেবে না। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে কাজ করা হবে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে। মতপ্রকাশে কোনো বাধা থাকবে না। কেউ গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হবে না, এ বিষয়ে আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি। এটাই হবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন আগামীর বাংলাদেশ।
কালবেলা : সম্প্রতি একটি বক্তব্যে আপনি বলেছেন ‘ঢেঁকি নরকে গেলেও ধান ভানে’। এ বাক্যটি কোন প্রেক্ষাপটে বলেছেন?
রুহুল কবির রিজভী : শেখ হাসিনার বিভিন্ন কল রেকর্ড ভাইরাল হচ্ছে। তিনি আসলে কী মেসেজ পাঠান, তিনিই ভালো জানেন। এসব তার আসল রূপের আরেকটি বর্ধিত অংশ। বাংলাদেশ সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে যে অভিন্ন অংশে আসা যায়, এটা তিনি শেখেননি। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো, আওয়ামী লীগের সমালোচকদের তিনি শত্রু মনে করেন। এসব ভ্রান্তির মাঝে থাকার কারণে তিনি এত রক্ত ঝরিয়েছেন। নিজে পৃথিবীর অন্যতম ফ্যাসিবাদী শাসক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার যে বৈশিষ্ট্য-হিংসা, প্রতিহিংসা, আক্রোশ, সেটা দেশে থাকতে যেমন ছিল, তেমনি ভারতে বসেও। তার কোনো অনুশোচনা নেই। একটা গান আছে, ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি...’। আসলেই তিনি মনে করছেন, দেশটা তার বাপের। যখন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, তখন যেমন তার কর্কশ প্রতিশোধের উচ্চারণ আমরা শুনেছি; এখন দেশের বাইরে বসেও তার হুমকি একইরকম। এজন্যই বলেছি, ‘ঢেঁকি নরকে গেলেও ধান ভানে’।
কালবেলা : আপনি বলেছেন ‘উপদেষ্টারা সরকারি চাকরিজীবীর মতো কাজ করছেন’। আপনার কাছে এরকম কেন মনে হলো?
রুহুল কবির রিজভী : চাকরিজীবীরা কোনো নীতি তৈরি করেন না। বরং ঊর্ধ্বতনের আদেশ অনুসরণ করেন। উপদেষ্টারা নীতিমালা তৈরি করবেন, সেটা বাস্তবায়নের গতিশীলতা থাকবে। কিন্তু সেই গতি নেই। সুশীল সমাজ বা চাকরিজীবীর ইমেজ নিয়ে সরকার চালানো বেশ মুশকিল। এজন্য পৃথিবীতে সরকার চালাতে রাজনীতিবিদের প্রয়োজন হয়। অথচ বিপ্লবী সরকার হিসেবে আরও বেশি কর্মতৎপর হওয়ার কথা ছিল। সেই কর্মতৎপরতা উপদেষ্টাদের মধ্যে দেখছি না। একেবার চিফ এক্সিকিউটিভের মতো কাজ করে যাচ্ছেন তারা। এটা তো ফ্যাশনেবল সরকারের কাজ। বিপ্লবী সরকার কখনো রুটিন ওয়ার্ক করতে পারে না। তাদের দিনরাত একাকার হয়ে যাওয়ার কথা। গণতন্ত্রের জন্য এত বড় বিপ্লবের পর যদি এখনো গণতন্ত্রের যাত্রাই শুরু করতে না পারি, তাহলে এটা বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। এজন্যই উপদেষ্টাদের সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে তুলনা করেছিলাম।
কালবেলা : উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা চলছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রুহুল কবির রিজভী : সরকার যে কোনো সময় উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে বা বাদ দিতে পারে। সব বিষয়ে বাইরে থেকে হস্তক্ষেপ করা ঠিক নয়। কিন্তু সরকারকে ভাবতে হবে, তারা বিশেষ পরিস্থিতিতে ভিন্ন ধরনের সরকার। সরকারের আইনগত বৈধতা যে খুব বেশি আছে এটা বলছি না, কিন্তু এ সরকার বৈধ। জনগণ যাকে সমর্থন করে, সেটাই বৈধ সরকার। সে ক্ষেত্রে জনগণের পছন্দ-অপছন্দের দিকে খেয়াল রাখতে হবে সরকারের। কে আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে সমর্থন দিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এসব জেনেই নিয়োগের ব্যাপারে বিবেচনা করা উচিত। সেটা না করতে পারলে সরকার নিজেই নিজের বিপদ টেনে আনবে। সবসময় ভুলের পরিমাণ বেশি হলে সরকারের খেসারত দিতে হবে।
কালবেলা : দেশবাসীর উদ্দেশে আপনি কী বলতে চান?
রুহুল কবির রিজভী : দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফল অন্তর্বর্তী সরকার। শেখ হাসিনার বিদায় ও স্বস্তির নিঃশ্বাস মানুষের প্রত্যাশা ছিল। মানুষ সেটা পেয়েছে। এ প্রত্যাশা যেন আরও বাস্তবভাবে ফুটে উঠতে পারে সেজন্য ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দলসহ সরকারের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এবার যেন গণতন্ত্রের যাত্রাপথে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেটা যেন আমরা নিশ্চিত করতে পারি। তাহলে গণতন্ত্র কখনোই ধ্বংস হবে না।