গৃহশ্রমকে শিশুশ্রমের তালিকাভুক্ত করার দাবি

শ্রমে নিযুক্ত সব শিশুই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। এমন তথ্য প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। এ সময় গৃহশ্রমকে শিশুশ্রমের তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংস্থার নেতারা। কারণ, গৃহশ্রমে নিযুক্ত বেশির ভাগই শিশু। তারা শতভাগ নির্যাতনের শিকার।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০২২: সংবাদপত্রের পাতা থেকে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ২০১১ সাল থেকে সংবাদপত্রকে উৎস হিসেবে ধরে শিশু সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সংবাদ নিয়মিত সংরক্ষণ করতে শুরু করে। ৫টি জাতীয় বাংলা দৈনিক এবং তিনটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত শিশু অধিকারবিষয়ক সংবাদ পর্যালোচনা করে এই তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি-২০২২’ এর সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করেন এমজেএফের কোঅর্ডিনেটর রাফেজা শাহীন। তিনি জানান, বাল্যবিয়ের হার ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে এসে ৯৪ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালে দেশের ২৩টি জেলায় ৪১,০৯৫টি বাল্যবিয়ের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে বাল্যবিয়ের সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ২৩০১টি। করোনার সময় অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে স্কুল বন্ধ থাকায় ও অভাব-অনটনের কারণে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেলেও ২০২২ এসে তা অনেক কমে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে শিশুধর্ষণের হার কমেছে ৩১.৫ শতাংশ। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৫৬০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৯৮ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ১২টি মেয়েশিশু। ২০২১ সালে শিশুধর্ষণের এই সংখ্যা ছিল ৮১৮ জন।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুধর্ষণ পারিবারিক পরিবেশে পরিচিতদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। একইভাবে পারিবারিক কারণেই বাল্যবিয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের পরিচিত লোকদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হওয়া ছাড়াও, প্রতিবেশীদের হাতে শিশুদের একটি বড় অংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর সর্বনিম্ন বয়স ২ বছর। ৩-৪ বছর থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুরা বেশি হারে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বেশির ভাগ শিশুকে খেলার সময় লোভ দেখিয়ে পরিচিতরা ধর্ষণ করছে। মূলত কম বয়সী শিশুরাই ধর্ষণের শিকার বেশি হচ্ছে। কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বন্ধুদের দ্বারা, কর্মক্ষেত্রে, স্কুল যাওয়ার পথে ও পরিবারের ভেতরে।

২০২২ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে পানিতে ডুবে ৪০৫ জন শিশু মারা গিয়েছিল, ২০২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১১৫২ জন। এদের মধ্যে ৫২০টি মেয়েশিশু ও ৬৩২টি ছেলেশিশু।

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা ২০২১ এর তুলনায় ২০২২ সালে কমে গেলেও, এই বছর ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার বেড়েছে। ২০২২ সালে মোট ৯৬টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যা ২০ জন, যা ২০২১ সালে ছিল ৬ জন।

বিভিন্ন কারণে রিপোর্টকালীন আত্মহত্যা করেছে ৪৪টি শিশু, যা ২০২১ তুলনায় কম। এদের মধ্যে ২৭ জন মেয়ে ও ১৩ জন ছেলে। ২০২১ সালে আত্মহত্যা করা শিশুর সংখ্যা ছিল বেশি অর্থাৎ ৭৮ জন। এদের মধ্যে ছেলেশিশু ৫৭ জন ও মেয়েশিশু ২১ জন।

মূলত পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, পরিবারের ওপর রাগ, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, উত্ত্যক্ত হওয়ার, ধর্ষণের শিকার হওয়ায় বা ধর্ষণচেষ্টা করায়, ধর্ষণের বা শ্লীলতাহানির বিচার না পাওয়ায় এবং সাইবার ক্রাইম বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

২০২২ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০২২ সালে ৩১১ জন শিশুহত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৪২টি শিশুকে। ২০২১ সালে হত্যার শিকার হয়েছিল ১৮৩ জন শিশু।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিয়ে আলাদাভাবে আধেয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট ১১টি এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা ১৫ জন এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। ১৫ জন গৃহকর্মী ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন নিহত, ৭ জন আহত ও ৩ জন আত্মহত্যা করেছে। নিহত গৃহকর্মীদের মধ্যে ৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ২ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ৬৯টি শিশু নিহত হলেও ২০২২ সালে এসে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৯৬। ২০২২ সালে মোট নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ২০। এরমধ্যে মেয়েশিশু ৬ জন ও ছেলেশিশু ১৪ জন। ২০২১ সালে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ছিল ৩৮। এরমধ্যে মেয়েশিশু ৩১ জন ও ছেলেশিশু ৭ জন।

২০২২ সালে যে ৩৫টি শিশু অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত, এদের মধ্যে ৬ জন মেয়েশিশুও আছে। তবে ২০২১ সালে অপরাধের সাথে জড়িত ছিল ১২০ জন, সবাই ছিল ছেলেশিশু।

২০২২ সালে অপহরণের শিকার হয়েছে ৩০ জন শিশু। অপহরণের কারণ হিসেবে টাকা, প্রেম, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, প্রতিশোধ গ্রহণ, পাচার ও মুক্তিপণ দাবির কথা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।

শিশু নির্যাতনের ৬৬টি ঘটনার মাধ্যমে ৬৮ জন শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ সালে শিশু নির্যাতনের ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনকারী হিসেবে গৃহকর্তা, বাবা-মা, শিক্ষক, উত্ত্যক্তকারী, স্থানীয় চেয়ারম্যান, চাকরিদাতা, প্রতিবেশী এবং সৎ মা।

শিশুকে নিয়ে ২৬টি বিষয়ের ওপর নেতিবাচক খবর ছাপা হয়েছে ২০২৮টি। অন্যদিকে ইতিবাচক সংবাদ ছাপা হয়েছে ১২টি বিষয়ের ওপর ৬৭টি।

সংবাদ সম্মেলনে এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘এমজেএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী শিশুরা নিজের বাসায় নিরাপদ নয়। শিশু ধর্ষণ ও শিশুকে যৌন হয়রানি বন্ধ করার জন্য সবাইকে এখুনি জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com