স্ট্রাইকার রুপনা এখন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক

নারী ফুটবল দলের অতন্দ্র প্রহরী রুপনা চাকমা।
নারী ফুটবল দলের অতন্দ্র প্রহরী রুপনা চাকমা।ছবি : সংগৃহীত

পাঁচ ম্যাচে একটি মাত্র গোল হজম করতে হয়েছে, তাও সেটা ফাইনালে। তবে গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী রুপনা চাকমার ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল স্ট্রাইকার হিসেবে। মাঝেমধ্যে মাঠে থাকতেন গোলবারের নিচে, ম্যাকশিফট গোলকিপার হিসেবে!

খেলাধুলার সঙ্গে পরিচয়হীন এক পরিবার থেকে উঠে আসার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না তার। আশপাশে থাকা ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছে। ডিঙাতে হয়েছে নানা বাধাবিপত্তি। ২০১৬ সালে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল শুরুর পর বদলে যেতে থাকে সেই দৃশ্যপট।

অবসরে হাস্যোজ্জ্বল রুপনা।
অবসরে হাস্যোজ্জ্বল রুপনা।ছবি : সংগৃহীত

নিজের শুরু সম্পর্কে রুপনা চাকমা কালবেলাকে বলেন, ‘মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে সর্বত্রই বাধা-বিপত্তি থাকে। আমার ক্ষেত্রেও ছিল। তারপরও আমি নিয়মিত ফুটবল খেলতাম। তখন খেলতাম স্ট্রাইকার হিসেবে। ২০১৬ সালে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল খেলার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। প্রথম আসরে খেলার সুযোগ না পেলেও কোচরা আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন নিয়মিত। তারা আমার মাঝে বড় ফুটবলার হওয়ার ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। মূলত কোচদের উৎসাহই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’

মায়ের গর্ভে থাকাকালীন বাবা গাজামনি চাকমা দুনিয়া ছেড়েছেন। দুই ভাই ও দুই বোনের পরিবারে সর্বকনিষ্ঠ রুপনা। অনটনের সংসারে তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। সে কারণে এই ফুটবলারের আজকের এ অবস্থানে উঠে আসার প্রতিটি পদক্ষেপই কঠিন।

মায়ের সঙ্গে গোলরক্ষক রুপনা চাকমা।
মায়ের সঙ্গে গোলরক্ষক রুপনা চাকমা।ছবি : সংগৃহীত

রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার দুর্গম ভুঁইয়াদাম গ্রামে বসবাস তাদের। যে জমিতে রুপনাদের জীর্ণ কুটির, সেটা প্রতিবেশী এক দাদার বলে জানিয়েছেন সাফজয়ী এ গোলরক্ষক। পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস কৃষিকাজ। অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চালান রূপনার মা কালাসোনা চাকমা।

সবকিছু মিলিয়ে আমাদের পক্ষে থাকার জন্য বাড়ি নির্মাণের বিষয়টি স্বপ্ন ছিল, অনেকটা অসম্ভবও ছিল। এখন সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি ও আমার পরিবারের সবাই কৃতজ্ঞ। যে কোনো স্থানে বাড়ি নির্মাণ করে দিলেই আমি খুশি। তবে রাঙামাটি শহরে হলে ভালো হয়।

রুপনা চাকমা, জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক

‘কৃষি ছাড়া ফুটবল এখন আয়ের বিকল্প উৎস। আমি রোজগার করা শুরুর পর থেকে কিছু জমিজমা ক্রয় ও বাড়ির নির্মাণের পরিকল্পনা করে আসছি। কিন্তু পরিবারের সবদিক ঠিক রাখতে গিয়ে তা করতে পারিনি। সাফ শিরোপা জয়ের পর জেলা প্রশাসক স্যার (মোহাম্মদ মিজানুর রহমান) অর্থ প্রদান করেছেন। যা কিনা আমাদের নতুন করে বাঁচতে সাহায্য করবে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তিনি আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন’—বলছিলেন রুপনা চাকমা।

কঠোর অনুশীলনে রুপনা চাকমা।
কঠোর অনুশীলনে রুপনা চাকমা।ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়ে দেশে ফেরার পর থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা। বাড়ি ফিরতে তর সইছে না রুপনারও। ‘দেশে আসার পর থেকে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। দেশি মুরগি ও নানা ধরনের সবজি পছন্দ করি আমি। মা সব গুছিয়ে রেখেছেন। আমি ছুটি পেলেই পছন্দের সব খাবার রান্না করবেন তিনি।’

দেশে আসার পর থেকে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। দেশি মুরগি ও নানা ধরনের সবজি পছন্দ করি আমি। মা সব গুছিয়ে রেখেছেন। আমি ছুটি পেলেই পছন্দের সব খাবার রান্না করবেন তিনি।

রুপনা

অবকাশযাপনে রুপনা চাকমা।
অবকাশযাপনে রুপনা চাকমা।ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বাড়ি নির্মাণের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, তাদের বাড়ি দ্রুত নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে নাকি এলজিইডি প্রকৌশলী ও নানিয়াচর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।

জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে রুপনা।
জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে রুপনা।ছবি : সংগৃহীত

‘সবকিছু মিলিয়ে আমাদের পক্ষে থাকার জন্য বাড়ি নির্মাণের বিষয়টি স্বপ্ন ছিল, অনেকটা অসম্ভবও ছিল। এখন সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি ও আমার পরিবারের সবাই কৃতজ্ঞ। যে কোনো স্থানে বাড়ি নির্মাণ করে দিলেই আমি খুশি। তবে রাঙামাটি শহরে হলে ভালো হয়। বলছিলেন রুপনা চাকমা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com