বিশ্বকাপে আর ‘দুধভাত’ নয় এশিয়ানরা

বিশ্বকাপে আর ‘দুধভাত’ নয় এশিয়ানরা

১৯৬৬-র ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ইতালি ও চিলিকে টপকে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চমকে দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। প্রথম ম্যাচে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, বিশ্বকাপে এশিয়ান দলের প্রথম পয়েন্ট ছিল ওটা। পরের ম্যাচে চিলির সঙ্গে ১-১ ড্র। শেষ ম্যাচে আরও বড় চমক— পরাশক্তি ইতালিকে ১-০ গোলে হারায় উত্তর কোরিয়া।

কোয়ার্টার ফাইনালেও শুরুটা দুর্দান্ত ছিল। পর্তুগালের বিপক্ষে ২৫ মিনিটেই ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় দেশটি। ফুটবল কিংবদন্তি ইউসেবিওর দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ৫-৩ গোলে হেরে উত্তর কোরিয়ার স্বপ্নযাত্রা থামে। ইউসেবিও করেন ৪ গোল।

উত্তর কোরিয়ার এই রেকর্ড টপকাতে লেগেছে ৩৬ বছর। ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো এই মহাদেশে বসে বিশ্বকাপের আসর। স্বাগতিক ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত খেলে দুই দলই দ্বিতীয় পর্বে উঠে যায়। জাপানের বিশ্বকাপ মিশন সেখানে শেষ হলেও থামেনি দক্ষিণ কোরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালিকে ২-১ গোলে হারানোর পর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জিতে জয়। এশিয়ার প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ে কোরিয়ানরা। ভালো খেলেও জার্মানির কাছে একমাত্র গোলে হার মেনে ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের।

এরপর একে একে চারটি বিশ্বকাপ পার হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার সেই রেকর্ড ছুঁতে পারেনি কেউ। দু-একটি দল মাঝেমধ্যে চমক দেখালেও বিশ্বফুটবলে সমীহ আদায় করার মতো দল হয়ে ওঠেনি এশিয়ার প্রতিনিধিরা। বড়জোর দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়েই শেষ হয়েছে বিশ্বকাপ যাত্রা। এ কারণে ফুটবল বোদ্ধাদের অনেকেই বিশ্বকাপে এশিয়ার প্রতিনিধিত্বকে ‘দুধভাত’ ছাড়া আর কিছু মনে করেন না।

কারণ বিশ্বকাপের কোনো কোনো আসরে এশিয়ার দু-একটি দল জ্বলে উঠলেও বাকিরা একেবারেই নজর কাড়তে পারে না। আবার যে দলটি এক বিশ্বকাপে ভালো করছে, পরেরবার তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন ২০০২ বিশ্বকাপে সেমিতে খেলার পর ২০০৬-এ গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া। সৌদি আরব ও জাপানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এশিয়ান কোটায় বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া অস্ট্রেলিয়াও এ পর্যন্ত ভালো কিছু করতে পারেনি।

ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকায় ক্লাব ফুটবলে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ চর্চা হয়। ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করা, সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য তৈরি করে দেওয়া পর্যন্ত ক্লাবগুলো অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। এশিয়ার কোনো দেশই তার ধারেকাছে নেই। বিশ্বের সেরা লিগগুলোতে এশিয়ান ফুটবলারের সংখ্যা আফ্রিকার তুলনায় পিছিয়ে। ইউরোপের তুলনায় সব দিক থেকেই এশিয়ার লিগ পিছিয়ে। এখানেই খেলোয়াড়দের মান ও মানসিকতায় বড় পার্থক্য। বিশ্বকাপের মতো আসরে যার প্রভাব দেখা যায়।

তবে দিন যে বদলাচ্ছে, তার নমুনা দেখিয়েছে এশিয়ানরা। আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে মেসির বিশ্বকাপ স্বপ্ন অনিশ্চিত করে তুলেছে সৌদি আরব। আরেক পরাশক্তি জার্মানিকে হারিয়েছে জাপান। গ্রুপের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ৩ পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়ার পর দুই দল দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে না পারলে তা হবে চরম হতাশার।

কাতার বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহেই দুই প্রাচ্যের দুই দেশ প্রমাণ করে দিয়েছে, ফুটবলে এশিয়ান দলগুলো শুধু অংশগ্রহণের জন্যই যায় না। ‘দুধভাত’ হয়ে না থেকে ইউরোপ-ল্যাটিন আমেরিকার বড় দলগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়াই করতেই বিশ্বকাপে অংশ নেয় এশিয়ানরা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com