ক্রান্তিকালে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি ফুটবলে

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা। দুনিয়াব্যাপী চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। জ্বালানি তেল, খাদ্যসহ সব রকম পণ্যের অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনই বাড়ছে খরচ। কিন্তু আয় বাড়ানোর পথটা হয়ে পড়ছে সংকুচিত। বিশ্বের দেশে দেশে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। কাজ হারানোর আতঙ্কে ভুগছে কোটি কোটি মানুষ। শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুর্দশাগ্রস্ত হলে উদ্ধারে এগিয়ে আসতে পারে সরকার। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো রাষ্ট্রগুলো নিজেই যেখানে দেউলিয়া হওয়ার পথে সেখানে নাগরিকদের জন্য কতটা কী করতে পারে?

দুনিয়া জোড়া এই চরম দুশ্চিন্তার মধ্যেই এসে গেছে বিশ্বকাপ ফুটবল ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। ৬ কেজি ১৭৫ গ্রাম ওজন আর ৩৬ সেন্টিমিটার উচ্চতার ট্রফির গায়ে নিজ দেশের নাম খোদাই করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে লড়ছে ৩২ দল। কিন্তু এ এমন এক লড়াই- যার রেশ কোনো ভেন্যু, দেশ, জাতি, ধর্ম-বর্ণ, দল-মতের মধ্যে সীমিত থাকে না। ফুটবল বিশ্বকাপ এলে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে যায় অন্য রকম এক উন্মাদনা। ব্রাজিলের রনডোনিয়ার মার্কোসের সঙ্গে বাংলাদেশের রাঙ্গুনিয়ার আক্কাসের কোনো পার্থক্য থাকে না। হলদে জার্সি জড়িয়ে ‘নেইমার, নেইমার’ চিৎকারে মিলেমিশে যায় বাংলা আর পর্তুগিজ ভাষা। লিওনেল মেসির ট্রফি উঁচিয়ে ধরা ছবিটা কল্পনা করে শিহরিত হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার তানদিল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল পর্যন্ত বিশ্বজোড়া ভক্তরা।

সংসার চালাতে হিমশিম অবস্থার মধ্যেই ক’টা টাকা বাঁচিয়ে প্রিয় দলের জার্সি কিনছেন সমর্থকরা। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব না কষে জার্মানির সাড়ে সাত কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানিয়েছেন মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন। শখের আমবাগান বিক্রি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবু কাউসার মিন্টু বানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ৪ কিলোমিটার পতাকা। বাড়িতে বাড়িতে উড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগালের পতাকা।

এ তো গেল বাংলাদেশের খবর। উপমহাদেশের কোনো দেশই বিশ্বকাপ উন্মাদনায় কম যায় না। একসঙ্গে খেলা দেখতে ভারতের কেরালার ১৭ বন্ধু মিলে আস্ত একটা বাড়ি কিনে ফেলেছেন। দাম? ২৩ লাখ টাকা। পাকিস্তানের করাচির দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছেন মেসি-নেইমাররা। ধরনটা একেক রকম হলেও বিশ্বের কোনো দেশই ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনার বাইরে নেই।

ফুটবলের এই দুনিয়া কাঁপানো উৎসব আসে প্রতি চার বছর পর। ফুটবলারদের পায়ের জাদুর পাশাপাশি আলোচনায় থাকে ভক্তদের যত কাণ্ডকারখানা। তবে এবার প্রেক্ষাপটটা যেন একটু আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল দেশ কাতার স্বাগতিক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চলছে নানা আলোচনা। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার থেকে শুরু করে মাঠে বিয়ার পানে নিষেধাজ্ঞা। এর মধ্যেই ঘুরেফিরে সামনে চলে আসছে অর্থনৈতিক মন্দা।

গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে বিশ্ব অর্থনীতির মহামন্দাকালেই আবির্ভাব বিশ্বকাপ ফুটবলের। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, আমন্ত্রণ পেলেও টাকা বাঁচাতে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি তখন পর্যন্ত অলিম্পিক ফুটবলে তিনবার স্বর্ণজয়ী ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ অনেক দেশ। বলে-কয়ে ১৩টি দলকে একসঙ্গে করতে পেরেছিলেন আয়োজকরা। কিন্তু খেলা শুরুর পর আর্থিক দুরবস্থা ভুলে ঠিকই ফুটবলে মেতে উঠেছিল লাতিন দর্শকরা। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে বিশ্বকাপে মোট টিকিট বিক্রি হয়েছিল ৫ লাখ ৯০ হাজার ৫৪৯টি।

ছবি : সংগৃহীত
কাতারে এখন সব সম্ভব!

১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপের সময়ও মহামন্দা কাটেনি। তবে খেলাটা ইউরোপে হওয়ায় আগ্রহী দেশের অভাব হয়নি। সেই সময় ফিফার সদস্য ছিল ৫০। এর মধ্যে বিশ্বকাপে খেলতে চেয়েছিল ৩২ দেশ। ফলে প্রথমবারের মতো চালু করতে হয় বাছাই পর্ব। ২০১০ সালেও দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। তখন ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপুল অর্থ ব্যয়ের সমালোচনা হয়েছিল। তার পরও বিশ্বকাপ সফল করতে অর্থ ব্যয়ে কার্পণ্য করে না স্বাগতিক দেশগুলো। ১৯৯০ বিশ্বকাপ আয়োজনে ইতালি খরচ করেছিল চার বিলিয়ন ডলার। ’৯৪-তে আমেরিকার ব্যয় হয় ৫ বিলিয়ন। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স ব্যয় করে ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে ব্যয় ছিল ৭ বিলিয়ন। ২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে এই ব্যয় আবার ৪ বিলিয়নে নেমে যায়। ২০১৪ সালে ব্রাজিল ১৪ বিলিয়ন ডলার খরচে বিশ্বকাপ আয়োজন করে তাক লাগিয়ে দেয়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও এর কাছাকাছি ব্যয় হয়।

আর এবার? অবকাঠামো নির্মানণহ নানা খাতে কাতার খরচ করছে ২২০ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা! হ্যাঁ, অঙ্কটা এমনই! বাংলাদেশের তিন বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়ে বেশি।

বিপুল এই অর্থ ব্যয় করে স্বাগতিক দেশের কিন্তু সরাসরি তেমন লাভ নেই। অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগের কারণে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে। কিছুটা হলেও বাড়ে সরকারের রাজস্ব আয়। তবে ব্যয়ের তুলনায় তা কিছুই না। তবে পরোক্ষ লাভটা হয় অনেক বেশি। সারা দুনিয়া থেকে লাখ লাখ পর্যটক এসে দেদার খরচ করায় চাঙ্গা হয় অর্থনীতি। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র দুনিয়াজোড়া পরিচিতির ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সৃষ্টি হয় নতুন সম্ভাবনা—যার সুফল আসতে পারে বহু বছর ধরে।

তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে বড় দাওটা মারে ফিফা। যেমন এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে চার বছরের চক্রে ফুটবলের বিশ্বসংস্থার আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলার। এখান থেকে খেলা আয়োজনের জন্য কাতারকে দেওয়া হবে ১৭০ কোটি ডলার। আর অংশ নেওয়া দেশগুলো সব মিলিয়ে পাবে ৪৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার।

ছবি : সংগৃহীত
সবাই মারা গিয়েছি!

রানার্সআপ হলে মিলবে ৩ কোটি ডলার। তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল পাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এমনকি গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও কমপক্ষে ৯০ লাখ ডলার পাবে এক একটি দল।

এ তো গেল স্বাগতিক, ফুটবলের অভিভাবক আর বিশ্বকাপে খেলা ৩২ দেশের আর্থিক লাভালাভের হিসাব। এর বাইরে যে, পৌনে দুইশ দেশ আর কয়েকশ কোটি দর্শক রয়ে গেল, তাদের পাওনাটা কোথায়?

বিশ্বকাপ উন্মাদনার যে ছবি দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানেই লুকিয়ে আছে এই প্রাপ্তি। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ আর খেলা দেখার জন্য ভক্তদের বহুমুখী আয়োজনে সব দেশেরই আছে অর্থনৈতিক প্রাপ্তি। জার্সি, পতাকা, হেয়ারব্যান্ড, কোর্টপিনসহ নানা পণ্যের ব্যবসা হয়ে ওঠে জমজমাট। বেড়ে যায় টেলিভিশন বিক্রি। মন্দায় স্থবির অনেকগুলো খাত কিছুটা হলেও চাঙ্গা হয়েছে বিশ্বকাপে।

তবে সব ছাপিয়ে বড় প্রাপ্তিটা কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে। করোনাকালে জীবন ও জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগেছে বিশ্ববাসী। দুঃসহ সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আগেই মন্দার পদধ্বনি। ভবিষ্যৎ চিন্তিত কোটি কোটি মানুষ। দুর্বিষহ এই সময়ে জরুরি একটু মানসিক প্রশান্তি। সেজন্য ফুটবলের বৈশ্বিক উৎসবের চেয়ে বড় উপলক্ষ আর কী হতে পারে?

৩২ দলের ৮৩২ ফুটবলারের মাঠের লড়াইয়ে মেতে থাকবে বিশ্ববাসী। তর্ক-বিতর্ক-বিশ্লেষণে, টানটান উত্তেজনায় দিন কাটাবে প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী। প্রিয় তারকার প্রতিটি পদক্ষেপে ভক্তকূল হবে শিহরিত। জীবনের আর সব চাওয়া-পাওয়া ফুটবলের কাছে হয়ে যাবে গৌণ। জীবন-জীবিকার চাপে পিষ্ট মানুষ যদি একটু স্বস্তি খুঁজে পায় ফুটবলে জীবনে ফুটবল, তা-ই বা কম কিসে?

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) জটিলতায় না গিয়ে ভুটানের মতো দেশ যেমন মোট জাতীয় সুখের (জিএনএইচ) হিসাবটাকেই বড় করে দেখে!

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com