কাজ হারানোর ভয়ে স্টার্টআপ কর্মীরা

কাজ হারানোর ভয়ে স্টার্টআপ কর্মীরা

বছর হিসেবে ২০২২ সাল ভালো যায়নি প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ জগতে। বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপগুলোতে গত এক দশকের মধ্যে বিনিয়োগের হার কমেছে সর্বাধিক। অর্থনৈতিকভাবে মন্দা বাজারের সেই হাওয়া লেগেছে দেশীয় স্টার্টআপ খাতেও। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে দেশের স্টার্টআপগুলোতে ফান্ডিং বা অর্থায়ন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। নজির আছে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ারও। এমন প্রেক্ষাপটে ছাঁটাই আতঙ্কে আছেন প্রযুক্তি খাতের উদীয়মান প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। ২০২৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হলে প্রতিষ্ঠানভেদে গড়ে ১৫ শতাংশ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকাভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পার্টনার্স-এর প্রকাশিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপগুলো সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থায়ন পেয়েছে ৪৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। ২০২১ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬৩০ বিলিয়ন ডলার। নিম্নমুখী এই ধারা অব্যাহত ছিল বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর জন্যও।

গেল বছর বাংলাদেশের ৪০টি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ৪৬টি লেনদেনের মাধ্যমে অর্থায়ন পেয়েছে প্রায় ১০৯ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ২২ মিলিয়ন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সর্বোচ্চ ৬৯ মিলিয়ন, তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সর্বনিম্ন ৫ মিলিয়ন এবং চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বিনিয়োগ হয় ১৩ মিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পায় শপআপ। শপআপে বিনিয়োগের পরিমাণ আলাদা রাখলে গড়ে প্রতিটি স্টার্টআপ প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পায়।

গত এক দশকের হিসাব বলছে, ২০১৩ সালে দেশীয় স্টার্টআপগুলোতে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০.৩ মিলিয়ন ডলার। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সেটি বেড়ে হয় যথাক্রমে ১৫ এবং ১৯.২৯ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা কমে ৬.৮৮ মিলিয়ন ডলার হলেও ২০১৭ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৫.৬৫ মিলিয়নে। ২০১৮ সালে স্টার্টআপগুলোতে আসা বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১০৭.৩৬ মিলিয়ন, ২০১৯ সালে ৮৪.৩৯ মিলিয়ন এবং ২০২০ সালে ছিল ৪০ মিলিয়ন ডলার। তবে ২০২১ সালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ পায় দেশীয় স্টার্টআপগুলো। এ বছর সর্বোচ্চ ৬২টি লেনদেনে ৪১৫.৩৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়।

কাজ হারানোর ভয়ে স্টার্টআপ কর্মীরা
প্রাথমিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়ে নয়ছয়

স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন কমে আসায় ছাঁটাই আতঙ্কে আছেন এ খাতে কর্মরত পেশাজীবীরা। এরই মধ্যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মেটা, আমাজন, গুগল এবং মাইক্রোসফটের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীসংখ্যা কমাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় স্টার্টআপ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের মতো না হলেও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। পরের পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ‘নীরব কর্মী হ্রাস’ শুরু হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধ রেখেছে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া।

তবে একাধিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২২ সালে প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পাওয়া ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা ফিনটেক প্রতিষ্ঠান আই-ফারমার তাদের কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনছে। কর্মী হ্রাস করেছে ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান হাংরিনাকি। প্রতিষ্ঠানটিতে চীনভিত্তিক আলিবাবার বিনিয়োগ আছে। বিগত চার মাসে কর্মী কমিয়েছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রিয়শপ। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আশিকুল আলম খান কালবেলাকে জানান, পাইভোটের (ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তন আনা) কারণে ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, ফলে কর্মীদের চাহিদা রয়েছে।

অন্যদিকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখেছে গেল বছর সর্বোচ্চ বিনিয়োগ পাওয়া স্টার্টআপ শপআপ। তবে ‘এন্ট্রি লেভেল’ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আছেন আসা-যাওয়ার মাঝে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ অব স্টাফ জিয়াউল হক এই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কারও চাকরিতে হয়তো প্রভাব পড়ছে। আর আমাদের বেশিরভাগ মাঠকর্মী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী। তারা এমনিতেই ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন করেন। তবে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আমাদের এখানে কম। বরং আমাদের ব্যবসা বড় হচ্ছে, বিশেষ করে লজিস্টিকস খাতে। তবে আরও ছয় মাস থেকে এক বছর খুব সংগ্রাম করতে হবে আমাদের।

অন্যদিকে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চালডাল ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রেখেছে। বিগত ছয় মাস ধরে কর্মীসংখ্যা কমানোর পাশাপাশি বেতন কমানো হয়েছে সেবা এক্স ওয়াই জেডে। টেলিমেডিসিন খাতের স্টার্টআপ ‘ডক্টরোলা’ তাদের কর্মী যেখানে হ্রাস করেছে সেখানে ব্যবসাই গুটিয়ে নিয়েছে ‘মায়া’। কর্মী কমানো স্টার্টআপের তালিকায় রয়েছে কৃষিজাত পণ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘ফসল’।

কাজ হারানোর ভয়ে স্টার্টআপ কর্মীরা
ছড়িয়ে পড়ুক হিরার দ্যুতি

ফসলের বিনিয়োগকারী ই-ক্যাবের ফিন্যান্স সেক্রেটারি আসিফ আহনাফ বলেন, মূলত দুটি কারণে আমাদের প্রায় ১৫ শতাংশ লোকবল কমিয়ে আনতে হয়েছে। এক হচ্ছে ব্যবসা কার্যক্রমের একটি বড় অংশ ‘অটোমেশন’ বা স্বয়ংক্রিয় মাধ্যমে চলে এসেছে। আর দুই, বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থায়ন কমে যাওয়া। তবে আমরা দ্রুতই এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।

স্টার্টআপে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়ে ডিজিটাল অটোমোবাইল খাতের প্রতিষ্ঠান যান্ত্রিকের প্রধান নির্বাহী শুভ আল ফারুক বলেন, পুরো বিশ্বে স্টার্টাআপ ফান্ডিং ৯৪ শতাংশ (বিগত এক দশকের তুলনায়) কমে গিয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও আছে। দেশের স্টার্টআপগুলোর বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে এবং সত্যিকার অর্থে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। কেউ হয়তো প্রকাশ্যে এই তথ্য বলছে না; কিন্তু ভেতরে ভেতরে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্পদ ধরে রাখতে পারছেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই এটি বোঝা যায় যে, ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও সংগ্রাম করছে। তবে সফটওয়্যার বা আউটসোর্সিং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই।

এ বিষয়ে ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের পরামর্শক জীশান কিংশুক হক কালবেলাকে বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক বাজারমুখী যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান; তারা এ মন্দায় প্রভাবিত হয়েছে। কিছু স্টার্টআপ বৈশ্বিক মন্দার কারণে তাদের বিনিয়োগ তুলতে পারছে না। এখন তারা ব্যবসা ছোট করে ফেলছে। যারা করোনার সময় চাহিদার কারণে কর্মী বাড়িয়েছিল, করোনার পরে সেই কর্মীই বাজার চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কর্মী কমাচ্ছে। ফেসবুক, গুগল, আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বলেছে যে, তাদের কর্মী হ্রাসের পেছনে এটা অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে ২০২৩ সাল খুবই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বছরটির দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ট্রানশন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ডিভাইস বাজারের সবাই সংগ্রাম করছে। মোটাদাগে বলা যায়, আমাদের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমে গেছে। উপরন্তু ডিভাইস উৎপাদনের জন্য ৩ মাস আগে থেকে কাঁচামাল আমদানি করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়; কিন্তু আমরা এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি করতে পারছি না। প্রায় ৭০ শতাংশ এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) কমে এসেছে আমাদের। এমনটা অব্যাহত থাকলে আগামীতে হয়তো আমাদের কর্মী হ্রাস করতে হবে। তবে প্রতিবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকটা তুলনামূলকভাবে ভালো যায়। এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও বাজার ইতিবাচকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছি। যদি এমনটা না হয়, তাহলে যে পরিমাণ বিক্রি কমবে সেই অনুপাতে কর্মী হ্রাস করতে হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com