এ যুদ্ধ কত দিনের

মহসীন হাবিব
মহসীন হাবিব

প্রায় এক বছর আগে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, তখন অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ওয়ার এক্সপার্টরা মনে করেছিলেন, এ আক্রমণের নিশ্চয়ই সমাপ্তি ঘটবে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই। কারণ, ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে রাশিয়া পার্শ্ববর্তী জর্জিয়ায় আক্রমণ করলে দেশটি ১৬ দিনের মাথায় পরাজয় মেনে নিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, ন্যাটোর জড়িয়ে পড়া ও ইউক্রেনের প্রতিরোধের ধরন এখন গোটা বিশ্বকে এক ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। সে বার্তাটি হলো—এ যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, কোন কোন দেশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়বে এবং কত মানুষকে জীবন দিতে হবে তার খবর কারও জানা নেই!

অসম্ভব নয় যে বহুকাল চলবে এ যুদ্ধ। গোটা পৃথিবীকে একটি নিউ শেপ, নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে নিয়ে আসবে। পেছনের দিকে ফিরে তাকালে চোখ খুলে যায়। দীর্ঘ যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ৫৪ খ্রিষ্টপূর্বে শুরু হওয়া রোমান-পার্সিয়ান যুদ্ধ চলেছিল ২০০ বছর! ১৩৩৭ সালে শুরু হওয়া ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৪৫৩ সালে। ১১৬ বছর ধরে এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকলেও ইতিহাসে এটি ‘শত বছরের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। মধ্যযুগেই ইউরোপে আরেক যুদ্ধ চলেছিল ৩০ বছর (১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত), যা আরও কয়েকটি যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। ১২ বছর চলেছিল নেপোলিনীয় যুদ্ধ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ চলেছে ৪ বছর, মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধ চলেছে ২ বছর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলেছে ৪ বছর, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলেছে প্রায় ৬ বছর। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলেছে প্রায় ১০ বছর, সোভিয়েত ইউনিয়ন-আফগানিস্তান যুদ্ধ চলেছে ১০ বছর, ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলেছে ৮ বছর, ফিলিপিনস-আমেরিকা যুদ্ধ চলেছে ৩ বছর, কোরীয় যুদ্ধ চলেছে ৩ বছর।

স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ চলেছে ৮ মাস এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছে ৯ মাস। এর প্রায় প্রত্যেকটি যুদ্ধে পৃথিবীর মানচিত্র পাল্টেছে, সৃষ্টি করেছে নতুন জাতি, বিলুপ্ত করেছে অনেক পুরোনো স্বতন্ত্র জনপদ।

ইতিহাস থেকে আমরা দেখেছি, যুদ্ধ যখন দীর্ঘায়িত হয়, তখন নানা কারণে অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে; জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মধ্যযুগের পর থেকে। মধ্যযুগের ইউরোপের ৩০ বছরের যুদ্ধে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে ফ্রাঙ্কো-স্প্যানিশ যুদ্ধ এবং পর্তুগাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার উৎপত্তি হয়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একে একে জড়িয়ে পড়ে অনেক রাষ্ট্র; ইউরোপ মহাদেশ ছেড়ে আন্তঃমহাদেশীয় যুদ্ধে পরিণত হয়। বদলে যায় মানচিত্র, বিভিন্ন জাতিসত্তার রূপ। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, পৃথিবী যত আধুনিক হয়েছে, যোগাযোগ ও বাণিজ্য যত প্রসারিত হয়েছে, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫৪ খ্রিষ্টপূর্বে ২০০ বছর যুদ্ধ হলেও তা রোমান এবং পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার শত বছরের যুদ্ধে আঁচ অপরাপর বিশ্ব থেকে খুব একটা প্রত্যক্ষ করা যায়নি। এর প্রধান কারণ, বাণিজ্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় না থাকলে অন্য দেশগুলো যুদ্ধে না জড়িয়ে বরং বিবদমান দেশগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু বিশ্বে এখন আর সে অবস্থা নেই।

মহসীন হাবিব
জার্মানিতে ট্রেনে ছুরি হামলা, নিহত ২

আধুনিক বিশ্বে অর্থাৎ এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে অন্য আরেকটি দেশ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। এখন দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব হাজার হাজার মাইল দূরের আরেকটি দেশে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তার জ্বলন্ত প্রমাণ ইউক্রেন যুদ্ধ। প্রকৃত ঘটনা হলো, এ যুদ্ধে আমেরিকাসহ ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো প্রায় সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে মস্কোও একটি আন্তর্জাতিক বলয় সৃষ্টি করে ফেলেছে। সে কথায় পরে আসছি।

যুদ্ধের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো একটি পক্ষ পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা একটি পক্ষের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শক্তি প্রয়োগ চলতেই থাকে। আর সে কারণেই ইউক্রেন যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা যাচ্ছে না। গত বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে রাশিয়ার সেনারা ঢুকে পড়ে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে। তারা নিপেয়ার নদী উপকূল দিয়ে দনবাস অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। কিন্তু এপ্রিল মাসেই ইউক্রেনের সেনারা পশ্চিমাদের সহায়তায় অল্প-বিস্তর প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে ওঠে এবং ইউক্রেনের যে বিশাল অঞ্চল রাশিয়া দখল করে নিয়েছিল, যে অঞ্চলের বেশ কিছু জায়গা থেকে রাশিয়ান সেনাদের পিছু হটতে হয়। লড়াই তীব্র হতে থাকে। রাশিয়া গত সেপ্টেম্বর মাসে দখলকৃত লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝিয়া এবং খেরসন অঞ্চলে গণভোটের আয়োজন করে রাশিয়ার প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেয়।

পূর্ব থেকেই ওই অঞ্চলগুলোতে ৩০ শতাংশ রুশ ভাষাভাষি ইউক্রেনীয়দের বসবাস। এখন ওই অঞ্চলগুলোতে কোনো হামলা রাশিয়া তার অধিকৃত অঞ্চলে হামলা বলে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করছে তা শুধু গত বছর দখলীকৃত অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং তারা ২০০৮ সালে রাশিয়া অধিকৃত ক্রিমিয়া অঞ্চলকেও উদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরাসরি সৈন্য ব্যবহার না করলেও এ যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র, ড্রোন, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান, আধুনিক ট্যাঙ্ক সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কয়েকটি ধনী দেশ। তারা সেই অস্ত্রের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলের মার্সেনারি ফোর্স। অন্যদিকে রাশিয়া যুদ্ধে নামিয়েছে ওয়াগনার গ্রুপ, যারা ভাড়া করা মিলিশিয়া। সেই সঙ্গে চেচনিয়ার শাসক রমজান কাদিরভের সমর্থক ও সিরিয়ার আসাদ সমর্থক যোদ্ধাদের।

মহসীন হাবিব
২০১৯ সালে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল ভারত-পাকিস্তান

প্রত্যক্ষ না হলেও এরই মধ্যে কিন্তু পরোক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়েছে রাশিয়া ও ন্যাটো ব্লকের মধ্যে। কারণ, আধুনিককালের যুদ্ধ শুধু সমরাস্ত্র দিয়েই হয় না। যুদ্ধ হয় অর্থনীতির, যুদ্ধ হয় সাইবার আক্রমণের মধ্য দিয়েও। অসংখ্যবার যুক্তরাষ্ট্রে, ইংল্যান্ডে ও জার্মানিতে পুতিন সমর্থকরা এবং রাশিয়ায়, বেলারুশে পশ্চিমা সমর্থকরা মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধটা আরও তীব্র। রাশিয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা চলছে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় দেশগুলো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছে। রাশিয়ার পক্ষের অন্যতম দেশ চীন নিষেধাজ্ঞার ধার ধারছে না। পশ্চিমা বিরোধী আরেক দেশ ইরান নিষেধাজ্ঞা তো মানছেই না, বরং ইরানে তৈরি অসংখ্য ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে ইউক্রেনে আক্রমণের ক্ষেত্রে। ‘শত্রুর শত্রু, আমার মিত্র’ এ মন্ত্রে রাশিয়া নীরব ও সরব সমর্থন পাচ্ছে ইরান, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়ার আসাদ সরকার ও বেলারুশসহ আরও কয়েকটি দেশের। শীতল যুদ্ধের সময়ের মতোই অত্যন্ত কৌশলে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে ভারত, সৌদি আরবের মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশসহ আরও কিছু দেশ। এদিকে প্রায়ই তাইওয়ান প্রশ্নে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চীন-আমেরিকা সামরিক শক্তি। একটি গুলি ফুটলে সেখানেও ঘটে যাবে ভয়াবহ যুদ্ধ। এটাও অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধের বাই-প্রোডাক্ট বলা যায়।

এ যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে কোন দেশ কার পক্ষে থাকতে পারে তাও মোটামুটি নির্ধারণ হয়ে গেছে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, তা হলো এ যুদ্ধ অতি শিগগির আলোচনার টেবিলে বসে সমাধানের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আবার এটাও ঠিক, পশ্চিমা দেশগুলো এ যুদ্ধ ইউক্রেনের বাইরে সম্প্রসারিত হোক, তা কোনোক্রমেই চাচ্ছে না। তার কারণ তারা বড় যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানে। তারা জানে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা হলে যুদ্ধে আরও অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করবে রাশিয়া। প্রয়োজনে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না। তাই ইউক্রেনকে সামরিক সহযোগিতা দিলেও যুদ্ধ যাতে রাশিয়ার মাটিতে না গড়ায় সে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।

কিন্তু যত অস্ত্রই ইউক্রেনকে দেওয়া হোক, রাশিয়া যে দখলকৃত এলাকা থেকে একবিন্দু রক্ত থাকতে সরে যাবে না সেটাও পরিষ্কার। তাহলে এর শেষ কোথায়? আমাদের মতো ছোট দেশগুলোরইবা কী হবে? মনে আছে, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কথা? তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চরমে। যে বাংলার মানুষ যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু জানত না, যুদ্ধে যাদের কোনো স্বার্থ নিহিত ছিল না, সেই বাংলার মানুষকে পথেঘাটে মরে পড়ে থাকতে হয়েছে, গুলির প্রয়োজন হয়নি। তেমন অবস্থা যদি আবার দেখা দেয় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ এরই মধ্যে আফ্রিকার অনেক দেশ জীবন-মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছে এ যুদ্ধের কারণে। বাংলাদেশ যে তরতর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছিল তা ধাক্কা খেয়ে আবার পিছিয়ে গেছে। তাই আগামী দিনগুলোর কথা ভাবলে সত্যিই দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com