সরস্বতী ও জ্ঞানচর্চা

অজয় দাশগুপ্ত
অজয় দাশগুপ্ত

ভদ্রলোককে আমি একবারই দেখেছিলাম। আমার মেজদি তখন এমএ পাস করে অধ্যাপনার জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছিল। ভদ্রলোকের প্রতিষ্ঠিত এখন নামকরা বিশাল কলেজটি তখন নিতান্ত নবীন। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে চলা শুরু করেছে মাত্র। দিদির সে ইন্টারভিউ যাত্রায় বাবাসহ আমিও গিয়েছিলাম কলেজ দেখতে। কুয়াশা কুয়াশা শীতের সকালে সৌম্য দর্শন ধুতি-পাঞ্জাবি চাদর গায়ে মানুষটি তার উপাসনা শেষ করে এসেছিলেন সবাইকে একনজর দেখে যেতে। চাকরিপ্রার্থীদের দেখতে আসা আশীর্বাদ করার মতো কলেজের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন দেশে। সে সময়কাল এখন ভাবাও যাবে না।

এর বছরখানেক পরই তিনি দেশ, দেশের মানুষ, শিল্প ও শিক্ষা ভালোবাসার চরম মূল্য দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। হিন্দু-মুসলিম এ দুই জাতিসত্তার জন্য পৃথক রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানে সম্ভব হলেও বাংলায় হয়নি। বাঙালি তার সংস্কৃতি ঐতিহ্য অতীতে বরাবর সহাবস্থানে বিশ্বাসী। যেহেতু তিনি হিন্দু পাকিস্তানিদের চোখে ছিলেন মালাউন। তাতে কি? দারিদ্র্য অভাব-অনটন কষ্ট পেরিয়ে সফল মানুষটি একবারের জন্যও ভাবতে পারেননি তিনি হিন্দু বলে দেশের কেউ নন। স্কুল-কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে হিন্দু-মুসলিম সবার শিক্ষা নিশ্চিত করা শিল্প ব্যবসায় সবাইকে চাকরি দেওয়া এই ছিল তার ব্রত। তাকে অনেকেই মনে করিয়ে দিত তিনি যত যাই করেন না কেন, তিনি একজন হিন্দু। কিন্তু তিনি সেসব মানতেন না। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা যত শিক্ষক স্বয়ং আনিসুজ্জামান স্যারও তার বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।

একাত্তরের যুদ্ধের এক মাস না গড়াতেই পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছিল ঘাতক সাকা চৌধুরী। পাকিস্তানি সেনারা যে কোনো কারণেই হোক, মৃত্যু নিশ্চিত করা ব্যতিরেকেই ফেরত যাচ্ছিল কিন্তু দালাল তা মানতে নারাজ। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে লেখা আছে সাকার গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি। সরস্বতী কোথায় থাকেন জানি না। কিন্তু এটা নিশ্চিত এমন শিক্ষা অনুরাগী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী মহান মানুষকে তিনি যে তার ক্রোড়ে আশ্রয় দিয়েছেন এটা আমি নিশ্চিত।

সরস্বতীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক শিক্ষার। যে মূর্তি আমরা দেবীরূপে পূজা করি তার বাহন হাঁস। তার হাতে বীণা। পদতলে পুস্তক। শিক্ষা সংস্কৃতি আর শুভ্রতার প্রতীক দেবী কি আড়ম্বর ভালোবাসবেন না নিভৃতে যে বা যারা তার সাধনা করেছেন তাদের ভালোবাসবেন? আমরা এমন একজন মানুষকে জানি যিনি সাধারণের ভেতর ছিলেন অনন্য অসাধারণ। তার সাদামাটা জীবনযাত্রা দেশের পরিবেশ বা সমাজে কিছুই না। কারও চোখে পড়ার মতোও ছিল না। তিনি ফতুয়া-লুঙ্গির বাঙালি। নানার জমিদারির খাজনা উসুল করতেন। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা জমিও পেয়েছিলেন। কিন্তু আয়েশি জীবন নয়, ঝোঁক ছিল অন্যকিছুর। মনে সুপ্ত বাসনা ছিল ভিন্ন কিছু করার। শুরু করেছিলেন পুস্তক বিতরণ। কী অভিনব! একজন মানুষ খালি পুস্তক দেওয়ার জন্য, তাও বিনামূল্যে—কেউ এমন পথেঘাটে ঘুরে বেড়াতে পারে, এটা তো খাদক সমাজে ভাবাও পাপ। কিন্তু সে কাজটিই তিনি করতেন।

শুরুতে একটি স্কুলের মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনকে বই উপহার দিতেন। দেখলেন আরও অনেকে বই পড়তে চায়। কী করা উচিত ছিল?

আমরা হলে সুবিধামতো জায়গায় বইয়ের একটা দোকান খুলে বই বিক্রি করতাম, সঙ্গে নিজেকে তুলে ধরার কাজ চালাতাম। বাংলাদেশে বাঙালি সমাজে এমন সুপরিচিত বিশেষজনও আছেন যিনি একদিকে যেমন পুস্তক জনপ্রিয় করে তোলার জন্য কিংবদন্তিতুল্য তেমনি গড়ে তুলেছেন বিশাল বইয়ের সাম্রাজ্য। বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ মানুষটি এসবের ধার ধারতেন না। তিনি করেছিলেন উল্টো কাজ। আমাদের অনেকেরই মধুমেহ রোগ আছে। চিকিৎসক বলার পর থেকে খালি হাঁটি আর হাঁটি। পৃথিবীর পথে পথে হাঁটার ভিড়ে মধুমেহ রোগীদের কেউ ঠেকাতে পারবেন না। তিনি শুধু হাঁটলেন না, বই নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। গ্রামে গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে বিনামূল্যে বই পৌঁছে দেওয়া মানুষটি আমাদের জনগণের পাঠ ক্ষুধা জাগিয়ে তোলার কাজটি করে গিয়েছিলেন আজীবন। আমার তো মনে হয় পরে তার ব্যাগে কি শুধুই বই থাকত? থাকত অক্ষয় জ্যোতি। সদা দীপ্ত রহে যে জ্যোতি। যে জ্যোতির কারণে তিনি প্রচার অপপ্রচার কিছুই বুঝতেন না। নিজে আলোর মতো ঘুরে বেড়িয়ে মানুষকে আলোময় করতেন। কেমন করে জানি ইত্যাদির চোখে পড়ায় একুশে পদকও পেয়েছিলেন তিনি। শ্রদ্ধা ও প্রণাম বইওয়ালা পলান সরকার।

উইলিয়াম রাদিচে বাংলা শিখেছিলেন বাংলা শিখবেন বলেই। অক্সফোর্ডে ইংরেজিতে ডিগ্রি করার পর তিনি ভাবছিলেন, অতঃপর কী করবেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যে তার আগ্রহ ছিল। তিনি একাধারে মৌলিক কবি ও অনুবাদক। অক্সফোর্ডে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পুরস্কারও লাভ করেছিলেন। সে যা-ই হোক, অক্সফোর্ডের অধ্যয়ন শেষ করে যখন তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ভাবছিলেন, তখন তার এক বাঙালি বন্ধু তাকে বাংলা পড়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কাজ করার মতো অনেক উপাদান তিনি বাংলা ভাষায় পাবেন।

এ ছাড়া যা তাকে তখন বাংলা পড়তে সত্যি সত্যি উদ্বুদ্ধ করে তা হলো, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম। অক্সফোর্ডে বাংলা শেখার ব্যবস্থা ছিল না, তাই উইলিয়াম রাদিচে বাংলা শিখতে যান লন্ডনের সোয়াসে। সেখানে তিনি বিভাগের প্রভাষক তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাংলা শেখেন। আমার সৌভাগ্য আমি রাদিচেকে সামনাসামনি দেখেছি। তার কণ্ঠে মুখস্থ জীবনানন্দের কবিতা শুনে পুলকিত হতে পেরেছিলাম। শুধু কি তাই? চট্টগ্রামে ফুলকি আয়োজিত সে অনুষ্ঠানে অনর্গল বাংলায় কথা বলে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি। অভিবাসী হয়ে সিডনি আসার পথে অর্ককে লিখে দেওয়া শুভাশীষ মোড়ানো খাতার পাতাটি নিয়ে এসেছিলাম। আমার বিশ্বাস রাদিচের মতো মানুষরা না থাকলে বিদ্যা মূলত কিছু সিলেবাসের বই-ই হয়ে থাকত।

আমার লেখায় যে তিনজন মানুষের কথা বললাম, ধর্মীয় পরিচয়ে একজন হিন্দু, একজন মুসলমান, আরেকজন ছিলেন খ্রিষ্টান। আমার বিশ্বাস ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক, তারা মানুষ ও পৃথিবীর মুক্তির দূত।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, সিডনি প্রবাসী

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com