আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) কেমন ছিলেন

মো. আবদুর রহিম
মো. আবদুর রহিম

আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) আশেকে রাসুল, আশেকে আউলিয়া এ কামেলীন ছিলেন। তিনি রেহনুমায়ে ত্বরিকত, মুর্শেদেনা সৈয়ুদেনা হজরত শাহসুফি আহমদুল হক সিদ্দিকী প্রকাশ মুসাবিয়া (র.)-এর মুরিদ ছিলেন। স্বীয় মুর্শিদের প্রতি তার ভক্তি, শ্রদ্ধা, বিনয়, আজিজী, আদব, গভীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। অর্থাৎ একজন সত্যিকার মুরিদানের নিজ পীরের প্রতি সম্পর্ক গভীর করতে আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের জন্য যে গুণগুলো প্রয়োজন ওইসব গুণ তার মধ্যে ছিল। তার জীবনাচার, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তিনি জীবনের চেয়ে আধ্যাত্মিক জগতে অধিক সময় ব্যয় করতেন।

আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) চট্টগ্রাম মহানগরীর তৎকালীন ডবলমুরিং থানার উত্তর আগ্রাবাদের অন্তর্গত মনসুরাবাদ এলাকার স্থায়ী নিবাসী। তার পিতা আলহাজ মরহুম আবদুল জলিল কন্ট্রাক্টর, মাতা-মরহুমা মগফুরা আম্বিয়া খাতুন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী-আল মুসাবী (র.) জন্মসূত্রে হাজত রাওয়া, মুশকিল কোশা, হজরত খাজা মনসুর আলী শাহর বংশধর। ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, হজরত মনসুর আলী শাহ (র.) সুলতানুল হিন্দ, খাজা এ খাজেগান, গরিবে নেওয়াজ, বান্দা নেওয়াজ, আতা-এ রাসুল, আওলাদে আলী, মাইনুল মিল্লাতে ওয়াদ্বীন, কুতুবুল মাশায়েখ, হজরত খাজা মাঈনুদ্দীন চিশতী হাসান সানঞ্জেরী আজমেরী (রা.)-এর বংশধর। হজরত মনসুর আলা শাহ (র.) নাম অনুসারেই মনসুরাবাদ এলাকাটির নামকরণ হয় বলে জানা যায়।

মনসুরাবাদ এলাকার অধিকাংশ অধিবাসী হজরত খাজা মনসুর আলী শাহ (র.)-এর আওলাদ ও বংশধর। উনার বংশধারা হজরত জিন্নাত শাহ (র.), হজরত শমসের আলী শাহ (র.) মাধ্যমে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। একটি শাখা মরহুম মগফুর আবদুল জলিল তৎপুত্র আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর ঔরশে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) পুত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন মেয়র, মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ মোহাম্মদ মনজুর আলম। আমার জানামতে, তিনি আল্লাহর হাবিবের একজন পেয়ারা উম্মত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-কে তার পুত্র আলহাজ মোহাম্মদ মনজুর আলম হজে যাওয়ার প্রস্তাব করলে তিনি বলেন, ‘এখন আমি হজে যাব না। কারণ আমার অনেক ঋণ আছে, তুমি তোমার আম্মাকে নিয়ে হজে যাও। আমার সময় হলে তখন আমি বলব।’

মো. আবদুর রহিম
এ যুদ্ধ কত দিনের

১৯৯১ সালে দেওয়ানহাট মসজিদের ইমাম আলহাজ মৌলানা আবদুল খালেক সাহেবকে আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) বলেন, ‘আমার ছেলেকে বলুন, আমি হজে যেতে ইচ্ছুক।’ তখন সঙ্গে সঙ্গে তার পুত্র আলহাজ মোহাম্মদ মনজুর আলম পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে হজে যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। তিনিসহ হজে গিয়ে দেখেন, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে হজে আকবরি ঘোষণা করা হয়েছে। সে সুবাদে বলা যায় আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) একজন আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক জ্ঞানের অধিকার ছিলেন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) আওলাদে মনসুর আলী শাহ হিসেবে বাল্যকাল থেকে আউলিয়ায়ে কামেলীন, বুজর্গানে দ্বীন, ছলফে ছোয়ালেহীনের আশেক, ভক্ত, অনুরক্ত ছিলেন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) হজরত মুসাবীয়া বাবাজানের কাছে বায়াত গ্রহণের পর থেকে তার ধর্মীয় চিন্তায়, ধ্যানধারণায় এক আমূল পরিবর্তন আসে। তার স্বীয় মুর্শিদের প্রতি অগাধ ভক্তি, গভীর শ্রদ্ধা, নম্রতা, বিনয়, রিয়াজত, রিয়াছত অধিক হারে বেড়ে যায় এবং নিজের জীবনকে খেদমতগার হিসেবে মুর্শিদের চরণে উৎসর্গ করেন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর আর্থিক অবস্থা সবসময় সচ্ছল না থাকার পরও তার মুর্শিদের বিশেষ দিবসগুলোতে বিশেষ করে ওরসের সময় নিয়মিত নজর নেওয়াজ জীব (গরু) নিয়ে মুর্শিদের কাছে হাজির হতেন।

একসময় আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে তখন তিনি তার মুর্শিদের মহব্বত ও সন্তুষ্টি হাসিলের লক্ষ্যে নিজের স্ত্রীর স্বর্ণের বালা বিক্রি করে জীব (গরু) নেওয়াজ নিয়ে মুর্শিদের দরবারে হাজির হয়ে যান। ইহা ছাড়াও তিনি হজরত মুসাবীয়া বাবাজানের শাদিয়ে মোবারকসহ দরবারে বিভিন্ন খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি অনেক বড় মনের অধিকারী মহৎ ও দানশীল মানুষ ছিলেন। তিনি আল্লাহর নবীর জীবনচরিত অনুসরণ করে জীবনযাপন করতেন। আগামী দিনের কথা চিন্তা না করেই মানুষদের তিনি অকাতরে দান সাহায্য করতেন। সময়ে সময়ে অকাতরে দান করার ফলে অনেক সময় তিনি আর্থিক সংকটে পড়তেন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর আওলাদের সূত্রে জানা যায় যে, ১৯৬০-এর দশকে তার আর্থিক অবস্থা খারাপের দিকে গেলে উত্তর আগ্রাবাদের মনসুরাবাদের পৈতৃক ভিটা ছেড়ে দিয়ে উত্তর কাট্টলিতে বসতি স্থাপন করেন।

একদা আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) তার মুর্শিদের সম্মুখে দণ্ডায়মান অবস্থায় শুনতে পান বাবাজানের কালাম। মুর্শিদের পক্ষ থেকে কালামে শোনেন, ‘আবদুল হাকিম, এত পেরেশান কেন? একটু ধৈর্য ধরো, সময় হলে তোমার ভক্তি, রিয়াজতের পারিশ্রমিক পাবে। তোমার দৌলত আসমান ছুঁবে।’ হজরত মুসাবীয়া বাবাজানের এ অমর বাণী অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর তৃতীয় পুত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ও কাউন্সিলর পদে ছিলেন। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) বড় সন্তান আলহাজ আবু তাহেরের পুত্র আলহাজ মোহাম্মদ দিদারুল আলম ২০১৪ ও ’১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে সীতাকুণ্ড-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

তার তৃতীয় ছেলে আলহাজ মোহাম্মদ মনজুর আলম অলি-আউলিয়াদের একজন শুধু সেবকই নন, তিনি দেশ-বিদেশে সুপরিচিত একজন সাদা মনের, উদার মানবতাবাদী সমাজসেবক ও সাবেক সফল মেয়র। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) পুত্র, নাতি-নাতনিরা আজ সমাজের সম্মানিত মানুষ। আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর মাজার স্থাপন, নিয়মিত জিয়ারত, অনবরত হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত, পবিত্র ওরস শরিফ উদযাপন। আলহাজ আবদুল হাকিম ও আলহাজ মোস্তফা খাতুনের নামে ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ফাউন্ডেশনের অধীনে প্রায় ৯০টি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এ ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদ, মক্তব, এবাদতখানা, জুমা মসজিদ ইত্যাদি থেকে প্রতিনিয়ত দোয়া ও ইছালে ছাওয়াব প্রেরিত হচ্ছে। এসবই মুর্শিদের প্রতি ভক্তি ও রিয়াজতের প্রাপ্তি হিসেবে পরিগণিত। মুর্শিদ হজরত মুসাবীয়া (ক: আ:) বাবাজানের কালামের বরকতে আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর সন্তানদের ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়। বর্তমানে মোস্তফা-হাকিম গ্রুপ সুপ্রতিষ্ঠিত একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এ গ্রুপে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ গ্রুপটি সুনামের সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রেখে যাচ্ছে।

আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত আলহাজ মোস্তফা হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ও আলহাজ হোছনে আরা মনজুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তার, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, অলি আউলিয়াদের সেবা, আর্ত-মানবতার সেবায় জনকল্যাণমূলক করে যাচ্ছে। অসহায় দুস্থ, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সেবা, ইফতারি, সাহরি বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, বয়স্ক ভাতা ও চিকিৎসা ভাতা প্রদান, গৃহহীনদের গৃহ, আশ্রয়হীনদের আশ্রয়, গরিবের অসুখে-বিসুখে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে, দাফনে-কাফনে, হজ ওমরায় বিয়েশাদি, গরিব শিক্ষার্থী শিক্ষায়, মসজিদ, মন্দির নির্মাণে এককথায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অকাতরে দান-অনুদান প্রদান করে যাচ্ছে।

আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.)-এর দেখানো পথেই তার সন্তানদের পথচলা। আধ্যাত্মিক সুপুরুষ ও আধ্যাত্মিক সাধক আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) এ দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। এ মহাপুরুষ দ্বীন-দুনিয়ার প্রয়োজনে ধর্ম-কর্মকে সমন্বয় করে একদিকে পীর ভাইদের আধ্যাত্মিকচর্চা, সমাজের নানারকম সমস্যার সমাধান এবং রাজনীতি করতেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। পাকিস্তান শাসন আমলে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি আগ্রাবাদে দুই-দুইবার নির্বাচিত মেম্বার পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাহাড়তলী আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আধ্যাত্মিক জগতের প্রাণপুরুষ আশেকে মোস্তফা, আশেকে মুরিদানে মুসাবীয়া আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারী (র.) ১৯৯৬ সালের ২৫ জানুয়ারি, ৪ রমজান ১৪১৬ হিজরি, ১২ মাঘ ১৪০১ বঙ্গাব্দ আল্লাহতায়ালার হুকুমে ইহজগৎ ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। প্রতিবছর নির্ধারিত তারিখে আলহাজ আবদুল হাকিম মাইজভাণ্ডারীর (র.) ওরস শরিফ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে উদযাপিত হয়। তার কর্মময় জীবন প্রজন্ম পরম্পরায় অনুসরণ হোক—এ কামনাই আমাদের।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা স্মৃতি পরিষদ

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com