তরুণ সমাজের সর্বনাশের কারণ টিকটক-লাইকি

তরুণ সমাজের সর্বনাশের কারণ টিকটক-লাইকি

বর্তমান প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন টিকটক-লাইকি তরুণ প্রজন্মের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে ১০ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে মধ্য বয়সী পর্যন্ত মানুষদের নানারকম ভিডিও পোস্ট করতে দেখা যায়। এগুলোকে ঘিরে হচ্ছে রমরমা ব্যবসা, বাড়ছে অপরাধ করার প্রবণতাও। এই মাধ্যমগুলোর নানান দিক নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক।

টিকটক-লাইকি কি আসলে কোনো বিনোদনের মাধ্যম?

তৌহিদুল হক : সময়ের সাথে সাথে আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন হচ্ছে। বিনোদনের ধরনগুলোও বদলে গেছে। প্রযুক্তির এই সময়ে কোনো কিছু বন্ধ করলে সবকিছু সমাধান হবে বিষয়টি এমন না। টিকটক-লাইকি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পাবে নাকি পাবে না সেটি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকেই ঠিক করতে হবে। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলে একটি বিধিনিষেধ বা রেজুলেশন থাকা দরকার। যেখান থেকে এই টিকটকের উৎপত্তি সেই চীনের তরুণ প্রজন্মই এরকম কনটেন্টে টিকটক ব্যবহার করে না। সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় মনিটোরিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। এই টিকটকের আসক্তির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বন্ধ করা হয়েছে, ইরাকে বন্ধ করা হয়েছে, পাকিস্তানে বন্ধ করা হয়েছে।

ছেলেমেয়েরা লুকিয়ে লুকিয়ে টিকটক করে। প্রজন্মের ব্যবধান হওয়ায় অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন যে, ছেলেমেয়েরা কী করছে, কোন দিকে ধাপিত হচ্ছে এবং কোন মাত্রার অপরাধ করছে। এর ফলে নারী পাচার ও ধর্ষণসহ অনেক অপরাধ হচ্ছে।

টিকটক-লাইকি ব্যবহার বা সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে?

তৌহিদুল হক : টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপের মাধ্যমে যারা এসব কনটেন্ট তৈরী করছে তারাও আসক্ত হয়েছে এবং যারা উপভোগ করছে তারাও আসক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। একটি হলো ব্যবহারকারী নিজে এবং অন্যটি হলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই সচেতন হতে হবে।

যারা টিকটক-লাইকির মাধ্যমে অপরাধ করেছেন এবং মামলাও হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি বলে কি এই অপরাধগুলো থামছে না?

তৌহিদুল হক : বাংলাদেশে অনেক মামলার কোনো ভবিষ্যত নাই। টিকটক-লাইকির মতো অপরাধের মামলাগুলো ভবিষ্যত খুবই ক্ষীণ। যদি আইনি ব্যবস্থাগুলো কার‌্যকরভাবে বা দৃষ্টান্তমুলক গ্রহণ করা যেত তাহলে এই অবস্থাগুলো তৈরি হতো না। টিকটক-লাইকির মাধ্যেমে যে অপরাধ ও প্রতারণা বাড়ছে সেগুলো সামাজিক ক্যান্সারের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ক্যান্সার যেমন একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায় তেমনি এই টিকটক-লাইকি বিনোদনের কথা বলে তরুণ প্রজন্মকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমে বা গণমাধ্যমে দেখা যায় যে, বিভিন্ন শ্যুটিং স্পটে অশ্লীলভাবে এসব ভিডিও করা হয় এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা রাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নিল কিনা সেই বিষয়গুলো মনিটোরিং করতে দেখা যায় না। তবে আগে রাস্তার মোড়ে মোড়ে রাস্তা বন্ধ করে এসব ভিডিও করা হতো। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে সেটি এখন অনেকটা কমেছে। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে লাইক-কমেন্টের একটি প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। এটি একটি প্রযুক্তিভিত্তিক সামাজিক অসুখ। যারা এই অসুখে আসক্ত তাদের বের করে নিয়ে আসতে না পারলে সমাজে প্রতারণা, বিশৃঙ্খলা ও আত্মহত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা বাড়বে।

টিকটক-লাইকির মতো অসুস্থ ধারার বিনোদনের মাধ্যম থেকে বের হওয়ার উপায় কী?

তৌহিদুল হক : পরিবার ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি শিক্ষকদের নৈতিক বক্তব্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন শ্যুটিং স্পটে অশ্লীলভাবে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও করা হলে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক মুল্যবোধ, পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি নিজেকে এ ধরনের অসুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে থেকে বিরত রাখতে হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com