রাজশাহী কি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে?

রাজশাহী কি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে?

নানা কারণেই রাজশাহীকে স্মরণ করতে হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বনফুল’ ছাপা হয় রাজশাহী থেকে ১৮৮০ সালের মার্চ মাসে। শ্রী কৃষ্ণদাস ছিলেন সেকালের বিখ্যাত ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকার সম্পাদক। তিনিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কাব্য ‘বনফুল’কে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। শুধু কি তাই! কৃষ্ণদাসের আগ্রহে রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রবন্ধ ‘ভুবনমোহিনী প্রতিভা’ এবং ‘অবসর সরোজিনী ও দুঃখসঙ্গিনী’ প্রকাশ হয় জ্ঞানাঙ্কুর পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আইনজীবী ও ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তো রাজশাহীর কৃতী সন্তান। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তথ্য মতে, কবির অমর সৃষ্টি ‘পঞ্চভূতের ডায়রি’ রচনার পরিকল্পনাও হয়েছিল রাজশাহীতে বসেই। আর এই পঞ্চভূতের এক ভূত তো রাজশাহীর অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।

লন্ডনে রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী এবং বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন লোকেন্দ্রনাথ পালিত। এই মহাশয় আবার কালক্রমে রাজশাহীরই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার আগ্রহেই রবীন্দ্রনাথ ১৮৯২ সালের নভেম্বরে রাজশাহী এসেছিলেন এবং ২৬ নভেম্বর, ১৮৯২ খ্রি. ‘শিক্ষার হের-ফের’ নামক একখানা প্রবন্ধ রচনা করে তা উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে পাঠও করেছিলেন। এ সভাটি হয়েছিল রাজশাহী কলেজে এবং এর উদ্যোক্তা ছিল রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। আজ থেকে ১৩০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজশাহীতে এসেছিলেন ঠিক আজকের দিনটিতেই। অধ্যাপক ফজলুল হক তার ‘রাজশাহীতে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন কবিগুরু চারবার রাজশাহী এসেছিলেন। অনেকে বলেছেন পাঁচবার এসেছেন। এ বিতর্কে না গিয়ে বলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কিশোর প্রতিভার উম্মেষস্থল রাজশাহীকে ভালোবেসেছিলেন এবং স্মরণেও রেখেছিলেন। ইতিহাসবিদ ও খ্যাতিমান আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় একসময় ‘উৎসাহ’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এর উদ্বোধনী সংখ্যাটিতেও কবিগুরু সূচনা লিখে দিয়েছিলেন (বাংলা ১৩০৫-পৌষ-ফাল্গুন)।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাজশাহী এসেছিলেন ১৯২৮ সালে (মতান্তরে ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর)। সাপ্তাহিক সওগাতের বিবরণ মতে কবি নজরুল রাজশাহী এসেছিলেন ১৯২৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। অনেকে বলেছেন রাজশাহী মুসলিম ক্লাব উদ্বোধন করেছিলেন কবি। তবে এ তথ্যটি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। কেননা, রাজশাহীতে কবির আগমন উপলক্ষে সওগাত পত্রিকায় যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল তাতে কোথাও উদ্বোধনের কথা বলা হয়নি। কবির রাজশাহী আগমনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন রাজশাহীর আরেক কৃতী সন্তান মাদার বখত্। বিশিষ্ট আইনজীবী ও ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র সঙ্গেও কবি সাক্ষাৎ করেন। ১৮ ডিসেম্বর তাকে রাজশাহীর নাগরিক সমাজ সংবর্ধনাও প্রদান করে। আলকা সিনেমা হল যেটি একসময় টাউন হল ছিল; এই টাউন হলেই কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটকের বাংলা চলচ্চিত্রের এই বিস্ময়কর মানুষটি এই রাজশাহীর সন্তান। শুধু চলচ্চিত্রকার হিসেবে নন, সাহিত্য ও নাট্য আন্দোলনে ঋত্বিক ঘটক স্মরণীয় হয়ে আছেন। রাজশাহীর সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের দুঃখ ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিবিজড়িত রাজশাহীর মিঞাপাড়ার বাসভবনটি এখন হোমিও কলেজের দখলে। জানি না এ দখলদারিত্ব থেকে ঋত্বিক ঘটকের বাসভবনটি মুক্ত হবে কিনা। ১৯৮৯ সালে জেনারেল এরশাদ ঋত্বিক ঘটকের বাসভবনটি রাজশাহী হোমিও মহাবিদ্যালয়কে দান করেছিলেন। সামরিক শাসক এরশাদের এই আদেশ সংবিধান মোতাবেক কতটুকু সম্মত এবং বৈধ তা বিবেচনা করার যথেষ্ট অবকাশ আছে বলে মনে করি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহীতে বিভিন্ন সময়ে সফর করেছেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী সভায় তিনি নৌপথে রাজশাহীতে এসেছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। এই রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহচর ও বন্ধুর সন্ধান আমরা জানতে পারি। বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম, রাজশাহী পৌরসভার একসময়ের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আ. হ. ম কামারুজ্জামান তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক সহচর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামেরও। রাজশাহীর পদ্মায় নৌভ্রমণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আবার বঙ্গবন্ধু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নৌপথে রাজশাহী এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আগমনের ৬২ বছর পর। যদিও তাদের ভ্রমণের কারণ ও উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। কথিত আছে—বঙ্গবন্ধুকে যে মাঝি নৌকায় রাজশাহীতে নিয়ে এসেছিলেন ১৯৫৪ সালে, স্বাধীনতার পর সে মাঝি দেখা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। মাঝিকে বঙ্গবন্ধু চিনেছিলেন। কুশল বিনিময় করেছেন। নাম ধরে ডেকে কিছু উপহার দিতে চাইলে মাঝি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলেছিলেন ‘নেতা! আপনি আমার নাম মনে রেখেছেন। আর কী চাই?’

১৯৩৭ সালে রাজশাহীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও বিদগ্ধ পণ্ডিত অন্নদাশঙ্কর রায়। খুব বেশিদিন স্থায়ী হননি তিনি। কিন্তু তার আত্মজীবনী ‘আমার যৌবন’ গ্রন্থে রাজশাহীর স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে। ইতিহাস অনুসন্ধানী গবেষকের কেউ কেউ বলেন রামায়ণের আধুনিক রূপকার কৃত্তিবাস ওঝা এই রাজশাহীর সন্তান। রাজশাহী জেলার প্রেমতুলীতে তার জন্ম। স্ত্রী চৈতন্য দেবও নাকি রাজশাহীর প্রেমতুলীতে এসেছিলেন—এমন কথা আমরা শৈশবে শুনতাম বৈষ্টুমী দিদিদের মুখে। বিখ্যাত লেখক প্রমথনাথ বিশীও রাজশাহীতে বাস করেছেন; রাজশাহী কলেজের কৃতী ছাত্র ছিলেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতক চক্র চার জাতীয় নেতাকে জেলে অন্তরীণ করে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জেলখানায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের আরেক নির্মম হক্যাকাণ্ড। আ. হ. ম কামারুজ্জামান শহীদ হন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এই সহচর জীবনের মায়াকে পরিত্যাগ করেছিলেন আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে।

রাজশাহী চিরকালই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর ছিল বলে মন্তব্য করেছেন গবেষক অধ্যাপক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা। তিনি বলেছেন—রাজশাহীর বিখ্যাত জমিদার খান বাহাদুর এমাদ উদ্দীন ও হাজী লাল মোহাম্মদ সরদার এবং শ্রীযুক্ত কিশোরীমোহন চৌধুরী ও সুরেন্দ্রমোহন মৈত্র রাজশাহীকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে প্রমাণ করেছিলেন। হিন্দু-মুসলিম এই সম্প্রীতি অটুট থেকেছে দীর্ঘকাল। পরিতাপের বিষয়, আজ রাজশাহীতে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি ও জামায়ত-শিবির চক্রের বিস্তার ও তাদের নৃশংসতার বহু নজির প্রকাশ্যমান।

ভাষাবিজ্ঞানী ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ দীর্ঘকাল রাজশাহীতে শিক্ষকতা করেছেন। শুধু ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ নন, ড. মুহা. এনামুল হকও ছিলেন রাজশাহীতে। ধ্বনিবিজ্ঞানী ড. আব্দুল হাইয়েরও স্মৃতিবিজড়িত শহর রাজশাহী। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ফোকলোর গবেষক ড. মাযহারুল ইসলামও দীর্ঘ সময় রাজশাহীতে ছিলেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বিশিষ্ট পণ্ডিত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলীও রাজশাহীর সন্তান। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, মুস্তফা নূরুল ইসলাম, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবু রুশদ এবং ড. আবদুল্লাহ আল-মতি শরফুদ্দিনও রাজশাহীতে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলা নাটকের অন্যতম দিকপাল খ্যাত মমতাজউদদীন আহমদের নাট্যপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে রাজশাহীতেই। রাজশাহীর তোফাজ্জল মাস্টারের অনুপ্রেরণায়। বিখ্যাত আইনজীবী ভাষাসংগ্রামী গোলাম আরিফ টিপুর রাজনৈতিক জীবনের সোনালি সময় কেটেছে রাজশাহীতেই। এই রাজশাহীর জেলখানায় বন্দি থেকেছেন বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসের প্রথম জেলহত্যা যেটা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত এটিও সংঘটিত হয়েছিল রাজশাহীতে। দার্শনিক অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমও বন্দি থেকেছেন রাজশাহীর জেলখানায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক রাজশাহীকে জন্মভূমির মমত্ব দিয়েই ভালোবাসতেন।

রাজশাহী কি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে?
রাসেল : বেদনার আঘাতে দগ্ধ এক শিশু

রাজশাহীর কৃতী সন্তান শহীদ আ. হ. ম কামারুজ্জামান হেনা। শিক্ষিত ও বনেদি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম কামারুজ্জামানের। তিনি রাজশাহীকে সজ্জিতকরণে ছিলেন অন্তপ্রাণ। শহীদ কামারুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ১৯৬৭ সালে, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য পদ ত্যাগ করে। আদর্শ রাজনীতি, দক্ষ সংগঠক হিসেবে কামারুজ্জামান রাজশাহীবাসীর কাছে এক আবেগের নাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতক চক্র চার জাতীয় নেতাকে জেলে অন্তরীণ করে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জেলখানায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের আরেক নির্মম হক্যাকাণ্ড। আ. হ. ম কামারুজ্জামান শহীদ হন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এই সহচর জীবনের মায়াকে পরিত্যাগ করেছিলেন আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে।

ইতিহাসের নানা ঘটনার কেন্দ্রভূমি আমাদের প্রিয় শহর রাজশাহী। অথচ আজ এই রাজশাহীজুড়েই সংস্কৃতি ও সাহিত্য-সাধনার দৈন্যদশা লক্ষ করা যায়। শিল্পের বিরুদ্ধে এখন মৌলবাদ সক্রিয়। রাজশাহী কি পারবে আবার ফিরে যেতে পুরোনো ঐতিহ্যে? কামারুজ্জামান হেনার সুযোগ্য পুত্র এ. এইচ. এম খায়রুজ্জামান লিটনের দিকে তাকিয়ে আছি সেই প্রত্যাশায়। 

লেখক- সংস্কৃতিকর্মী।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com