ইংল্যান্ডে ‘শয্যা সমাধি’ প্রথা ছড়িয়ে পড়েছিল যেভাবে

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে এভাবে বিছানা করে সমাধিস্থ করা হতো নারীদের
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে এভাবে বিছানা করে সমাধিস্থ করা হতো নারীদের

মধ্যযুগে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে বিরল একটি অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। যেখানে সম্পদশালী বা অভিজাত কেউ মারা গেলে এমনভাবে তাদের সমাধিস্থ করা হতো, যা দেখলে মনে হবে তারা বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। এটি পরিচিতি ছিল ‘শয্যা সমাধি’ হিসেবে। কিন্তু কীভাবে এই প্রথা ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে এতদিন তা ছিল অস্পষ্ট। তবে নতুন একটি গবেষণা জানাচ্ছে, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শয্যা সমাধির প্রচলন ঘটে এবং খুব শিগগিরই তা নারীদের জন্য সাধারণ দাফনের আচারে পরিণত হয়।

স্লোভাকিয়া থেকে ইংল্যান্ড পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে ৭২টি শয্যা সমাধি বিশ্লেষণ করার পর গবেষক দেখতে পান যে ইংল্যান্ডে শুধু নারীদের শয্যা সমাধিস্থ করা হতো। তিনি গবেষণার উপসংহারে বলেছেন, ইউরোপে এ ধরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চর্চা ছিল যখন খ্রিস্টান নারীদের মধ্যে অ-খ্রিস্টানদের বিয়ে করার চল মোটামুটিভাবে শুরু হয়েছে।

মধ্যযুগীয় প্রত্নতত্ত্ব জার্নালের অনলাইনে গত ১৩ জুন গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার একমাত্র লেখক এমা ব্রাউনলি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন। বর্তমানে তিনি গির্টন কলেজের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং ম্যাকডোনাল্ড প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফেলো।

গবেষক এমা বলেন, শয্যা সমাধিগুলো এমন কিছু ছিল, যা বিশেষভাবে কিছু নারীর দ্বারা আমদানি করা হয়েছিল, যারা নির্দিষ্ট পয়েন্টে (ইউরোপজুড়ে) সে সময় চলাফেরা করতেন।

এমা বলেন, ধর্মান্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে পুরুষরা স্থানান্তরিত হচ্ছিলেন। তবে সেটা নারীদের মতো একই পরিমাণে ছিল না। এরাই স্থানান্তরিত হওয়ার সময় মিশনারী হিসেবে তাদের সঙ্গে দাফনের এই আচার নিয়ে আসে। পরে ইংল্যান্ডের নারী সংঘ এবং খ্রিস্টধর্মের সমিতিগুলো তা গ্রহণ করে।

প্রেক্ষাপটের জন্য, ব্রাউনলি ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের দিকে ইঙ্গিত করেন, যার ফলে খ্রিস্টধর্ম প্রথমে হ্রাস পায় এবং তারপর আবার ইউরোপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

লাইভ সায়েন্সকে ব্রাউনলি বলেন, সেই সময় খ্রিস্টধর্ম একটি ধর্ম হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে চার্চের মাধ্যমে সেটিকে আবার ধাক্কা দেওয়া হয়। তারা সেই জায়গাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন যেগুলো খ্রিস্টান অধ্যুষিত নয় এবং লোকজনকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা শুরু করে। পোপ গ্রেগরি প্রথম ধর্মান্তর এবং মিশনারির ধারণাটি পুশ করেছেন। এর মধ্যে একটি উপায় হিসেবে খ্রিস্টান নারী এবং অ-খ্রিস্টান পুরুষদের মধ্যে বিয়েকে উৎসাহিত করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সেই সময় খ্রিস্টান পরিবারগুলোর একটি নির্দিষ্ট নীতি ছিল। তারা তাদের মেয়েদের ইংরেজ অভিজাতদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যারা সেই সময়ে অ-খ্রিস্টান ছিল। ধারণাটি ছিল যে স্ত্রীরা পরিবারগুলোতে ধর্মান্তরিতকরণে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবেন। তাই এই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীরা মূল ভূমিকা পালন করেছে।
এমা ব্রাউনলি, গবেষক

তার গবেষণাপত্র অনুসারে, প্রাচীনতম শয্যা সমাধির ঘটনাটি পূর্ব ইউরোপে ঘটেছিল খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে। প্রথাটি ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে পুরুষ, নারী এবং শিশুদের দাফনের একটি অনুষ্ঠান হিসেবে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে জার্মানিতে ছয় বছরের একটি ছেলেকেও এভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ব্রাউনলি বলেন যে, সপ্তম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে নারীদের সমাধিস্থ করার ক্ষেত্রে এটি সাধারণ হয়ে গিয়েছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের তিনটি শয্যা সমাধি থেকে আইসোটোপ বা তাদের নিউক্লিয়াসে বিভিন্ন সংখ্যক নিউট্রনসহ নানা উপাদান ছিল। যেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে যে নারীদের দাফন করা হয়েছিল তারা ব্রিটেনে বেড়ে ওঠেননি।

ব্রাউনলি এক বিবৃতিতে বলেন, এই রাসায়নিক প্রমাণই বলে দেয় যে ইংল্যান্ডে শুধু নারীদের ‘শয্যা সমাধিস্থ’ করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের নারীদের দ্বারা এটি আমদানি হয়েছিল। সম্ভবত সপ্তম শতাব্দীতে যারা ধর্মান্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের দ্বারাই এটি হয়েছে।

শয্যা সমাধির ক্ষেত্রে কী ধরনের বেড ব্যবহার করা হতো সে বিষয়ে ব্রাউনলি বলেন, এটি নির্ভর করতো ব্যক্তির অবস্থার ওপর। তিনি লাইভ সায়েন্সকে বলেন, তখন অনেকেরই নিজস্ব বিছানার ফ্রেম ছিল না। সামর্থবানরা শ্রমিক দিয়ে কাঠের বিছানা বানিয়ে নিতেন। তবে বেশিরভাগকেই খড়ের গদিতে শোয়ানো হতো। কিন্তু যদি দেখা গেছে কারও নিজের বিছানা থাকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাহলে সেটা হতো একটা বিশেষ কিছু।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com