‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামি নাম পাল্টে বনে যান অভিনেতা, ৩০ বছর পর ধরা

ওম প্রকাশ ওরফে পাশা
ওম প্রকাশ ওরফে পাশা

ভারতে ডাকাতি ও খুনের দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে ৩০ বছর পর গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামির তালিকায় থাকা ওই ব্যক্তি আত্মগোপনে থাকলেও তিনি আসলে চোখের সামনেই ছিলেন। কারণ ‘পলাতক’ জীবনে তিনি ২৮টি স্থানীয় হিন্দি সিনেমায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে একটিতে পুলিশের চরিত্রেও দেখা গেছে তাকে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ওই সদস্যের নাম ওম প্রকাশ ওরফে পাশা। সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্য পুলিশ তাকে গাজিয়াবাদের বস্তি থেকে গ্রেপ্তার করে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

তিন দশক ধরে নিজেকে পুলিশের চোখ থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী ওম প্রকাশ। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য হারিয়ানা পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামির তালিকায় ছিলেন তিনি।

হরিয়ানা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের উপ-পরিদর্শক বিবেক কুমার জানান, ১৯৯২ সালে একটি খুনের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পরই পালিয়ে বেড়াতে থাকেন ওম প্রকাশ। প্রায় এক যুগ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কর্পসের ট্রাকচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৮ সালে চার বছর যাবত কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জন্য তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। খুনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার আগেও তার নামে পুলিশের কাছে মোটরসাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্কুটার চুরির অভিযোগ ছিল। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হন ওম প্রকাশ, তারপর জামিনে ছাড়াও পান। ১৯৯২ সালে এক মোটরসাইকেল চালকের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের সময় তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন ওম প্রকাশ। সে সময় তার সঙ্গে থাকা আরেক আসামি ধরা পড়লেও তিনি পলাতক ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে অপরাধী ঘোষণা দিয়ে তার অভিযোগ জমা করে রাখে। খুনের ঘটনার পর ওম প্রকাশ পরিচয় লুকিয়ে তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন মন্দিরে পাঁচ বছর আত্মগোপনে ছিলেন। তারপর তিনি উত্তর ভারতে ফিরে আসেন এবং নুতন জীবন শুরু করে। সেখানে ট্রাকচালকের পেশা বেছে নেন। ১৯৯৭ সালে রাজকুমারি নামে এক নারীকে বিয়ে করে সংসার পাতেন। সেই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে।

পুলিশ আরও জানায়, ২০০৭ সালে স্থানীয় হিন্দি সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন ওম প্রকাশ। এতে গ্রাম প্রধান, ভিলেন, পুলিশ কনস্টেবলসহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনিত তাকারভ নামে একটি সিনেমা ইউটিউবে প্রায় ৭৬ লাখ বার দেখা হয়েছে। এ সিনেমার বিভিন্ন অংশ কয়েক কোটি বার ইউটিউবে দেখা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করলেও সামান্য একটি ভুল করেছিলেন ওম প্রকাশ। তিনি তার নতুন পরিচয়পত্র ও আধার কার্ডে নিজের ও বাবার আসল নাম ব্যবহার করেছিলেন। তবে তার এ অপরাধ জীবনের কথা কিছুই জানতেন না তার স্ত্রী রাজকুমারী ও সন্তানরা। তবে তিনি কিছু লুকিয়ে চলছেন তা ধারণা করতে পারতেন। একবার তার নিজ গ্রামে রাজকুমারীকে নিয়ে গেলেও তার পরিবারের সদস্যদের নিজের বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। কয়েক বছর পর রাজকুমারী জানতে পারেন তার আরেকটি স্ত্রী রয়েছে। তখন তিনি প্রতারিত বোধ করেন বলেও জানান। এ নিয়ে তাদের পরিবারে বেশ অশান্তিও লেগে থাকতো।

এর আগেও একবার হারিয়ানা পুলিশ তাকে চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল। সে সময় ছয়-সাত মাস কারাগারে থাকেন ওম প্রকাশ। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে জানান তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, ফলে তিনি ছাড়া পেয়েছেন। এ সময় গ্রেপ্তার হলেও হত্যা মামলায় পলাতক আসামি হিসেবে পুলিশের রেকর্ডে রয়ে গেছেন ওম প্রকাশ। রেকর্ডগুলো ডিজিটাল না হওয়ায় পুলিশ তাকে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেনি।

২০২০ সালে হারিয়ানা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করলে ওম প্রকাশের ফাইল সামনে আসে। তারপর সেখানকার বৃদ্ধদের কাছ থেকে জানতে পারে ওম প্রকাশ বর্তমানে উত্তর প্রদেশের কোনো এক স্থানে বসবাস করছে। তারপর তারা ওম প্রকাশের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন নম্বরের খোঁজ পায় এবং তাকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com