সমারটন ম্যান : মৃত্যুর ৭০ বছর পর রহস্যের সমাধান

তথাকথিত সমারটন ম্যানের আবক্ষ
তথাকথিত সমারটন ম্যানের আবক্ষ

ঘটনা ১৯৪৮ সালের। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের অ্যাডেলেড শহরের সমারটন পার্ক সমুদ্র সৈকতে পাওয়া যায় এক ব্যক্তির লাশ। স্যুট-টাই পরা অবস্থায় ছিল লাশটি। তার কলারে মেলে অর্ধেক খাওয়া একটি সিগারেট এবং পকেটে ছিল ফার্সি কবিতার একটি লাইন। কিন্তু তদন্তকারীরা কোনোভাবেই শনাক্ত করতে পারেনি হত্যাকারীকে। এরপর কেটে গেছে ৭০ বছরের বেশি সময়। তবে এতদিনে এসে একজন গবেষক বলছেন, তিনি ওই ঘটনার রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। বুধবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।

সেই সময় ঘটনাটি ‘সমারটন ম্যান’ নামে পরিচিতি পায়। বছরের পর বছর ধরে সেই লাশের রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারেনি কেউ। লোকটি গুপ্তচর ছিলেন এমন কথাসহ নানা তত্ত্ব সে সময় ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যাডিলেড ইউনিভার্সির গবেষক ডেরেক অ্যাবোটের বিশ্বাস খুন হওয়া ৪৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির নাম কার্ল ওয়েব। তিনি রাশিয়ান কোনো গুপ্তরচ ছিলেন না। তিনি আসলে মেলবোর্নে জন্মগ্রহণকারী একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী ও যন্ত্র নির্মাতা ছিলেন।

আমাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে যে ওয়েব তার স্ত্রীর থেকে আলাদ হয়েছিলেন। তারপর তার স্ত্রী দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। যত সম্ভব স্ত্রীর খোঁজ করতেই অ্যাডিলেডে এসেছিলেন ওয়েব।
অধ্যাপক অ্যাবোট

যদিও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশ এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। কিন্তু তার খুব শিগগিরই এ নিয়ে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।

১৯৪৮ সালের ১ ডিসেম্বর সৈকতযাত্রীরা অ্যাডিলেডের সমারটন সৈকতে একটি সি-ওয়ালের পাশে লাশটি পড়ে থাকতে দেখেন। লোকটি একটি স্যুট-টাই পরা ছিল। তার বয়স ৪০ বা ৫০ এর মধ্যে বলে তখন অনুমান করা হয়েছিল। তার পকেটে ছিল বাস ও ট্রেনের টিকিট, চুইংগাম, কিছু ম্যাচ, দুটি চিরুনি এবং এক প্যাকেট সিগারেট। তবে তার কাছে কোনো মানিব্যাগ, নগদ টাকা এবং কোনো পরিচয়পত্র ছিল না।

তার স্যুটের ট্যাগগুলি কেটে ফেলা হয়েছিল এবং ফরেনসিক বিভাগের পরীক্ষকরা সন্দেহ করেছিলেন যে তাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনা নিয়ে আরও যারা কৌতুহল দেখিয়েছেন তারা রীতিমতো বিভ্রান্ত হয়েছেন। তারা একটি স্যুটকেস, পোশাকে লেবেল মুছে ফেলা, অসংলগ্ন লেখাগুলোকে একটি কোড বলে মনে করছিলেন।

লোকটির হাতে একটি ছেড়া কাগজও ছিল, যাতে লেখা ছিল ফারসি শব্দ তামাদ শুদ। যার অর্থ ‘এটি শেষ।’ লাশ উদ্ধারের পর ‘সোমারটন ম্যান’ এর আঙুলের ছাপ সারা বিশ্বে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারেনি।

তাই শেষমেষ তাকে ১৯৪৯ সালে অ্যাডিলেড সমাধিক্ষেত্রে সমাধিস্থ করা হয়। তার সমাধিপ্রস্তরে লেখা হয়, ‘এখানে সেই অজানা লোকটি শুয়ে রয়েছে, যাকে সোমারটন সৈকতে পাওয়া গিয়েছিল।‘

সেই রহস্য সমাধানের জন্য গত বছর কবর থেকে লাশটি তোলে পুলিশ। কিন্তু অধ্যাপক অ্যাবোট তার নিজের পথ অনুসরণ করে ঘটনার অনুসন্ধান চালিয়ে যান।

কর্তৃপক্ষ যখন ওই ব্যক্তির মুখের প্লাস্টার মডেল তৈরি করে তখন ডেরেক অ্যাবট সংরক্ষিত চুল ব্যবহার করে ‘সমারটন ম্যান’র ডিএনএ বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন।

তিনি বিখ্যাত মার্কিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কলিন ফিটজপ্যাট্রিকের সঙ্গে এ কাজ করেন। যিনি এ ধরনের ক্রিমিনাল কেস সমাধানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পটু। তারা ডিএনএ বিশ্লেষণ করে একটি ‘এক্সটেন্ড ফ্যামিলি ট্রি’ তৈরি করেন। ৪ হাজার নামের জুটি থেকে কমিয়ে একটিতে নিয়ে আসা হয়েছে-কার্ল ওয়েব। তারপরে তারা লোকটির জীবিত আত্মীয়দের সন্ধান করেন এবং তাদের ডিএনএ ব্যবহার করে তার পরিচয় নিশ্চিত করেন।

অধ্যাপক অ্যাবোট বলেন, ওয়েব মেলবোর্নের একটি শহরতলিতে ১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তিনি বিয়ে করেছিলেন ডরোথি রবার্টসনকে, ‍যিনি ডফ ওয়েব নামে পরিচিত ছিলেন। সম্ভবত সেই সূত্রেই তিনি অ্যাডিলেডে এসেছিলেন।

এবিসি নিউজকে অধ্যাপক অ্যাবোট বলেন, আমাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে যে ওয়েব তার স্ত্রীর থেকে আলাদ হয়েছিলেন। তারপর তার স্ত্রী দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। যত সম্ভব স্ত্রীর খোঁজ করতেই অ্যাডিলেডে এসেছিলেন ওয়েব।

মার্কিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কলিন ফিটজপ্যাট্রিক এখন ওয়েবের মৃত্যুর বিষয়টির সমাধান করতে সহায়তা করতে চান বলে জানান অ্যাবোট।

সিএনএনকে তিনি বলেন, এখন আমি বিষ-বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে চাই এবং খুঁজে বের করতে চাই ডরোথির কী হয়েছিল।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com