রাশিয়া-ইউক্রেন শস্য রপ্তানি চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির জন্য গতকাল শুক্রবার তুরস্কের আঙ্কারায় এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির জন্য গতকাল শুক্রবার তুরস্কের আঙ্কারায় এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়রয়টার্স

বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেন অন্যতম। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পর কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইউক্রেনের পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। ভুগতে থাকে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। দীর্ঘমেয়াদে এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে বিশ্ব ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

এমন পরিস্থিতি জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি করতে ঐতিহাসিক এক চুক্তি করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। যেখানে রাশিয়ার পক্ষে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির অবকাঠামো বিষয়ক মন্ত্রী ওলেকসান্দার কুবরাকভ। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের খাদ্যশস্যের যোগান দেওয়া বড় দুটি দেশ। রশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর রপ্তানি যুদ্ধের আগের ‘ছয় ভাগের এক ভাগে’ নেমে আসে। ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য শস্যের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। দুর্ভিক্ষ এড়াতে বিশ্ব বাজারে গম, সূর্যমুখী তেল, সার এবং অন্যান্য পণ্য সরবরাহ করাই এই চুক্তির লক্ষ্য। চুক্তির অধীনে যুদ্ধ শুরুর আগের মতোই প্রতি মাসে পাঁচ মিলিয়ন মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা হবে। এছাড়া রাশিয়ার সার এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে কোন নিষেধাজ্ঞা থাকছে না, জাতিসংঘের সাথে এ ধরনের পৃথক একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর করেছে মস্কো।

কবে থেকে শস্য রপ্তানি শুরু হবে?

কবে নাগাদ শস্য রপ্তানি শুরু হবে, এ বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু জানিয়েছেন, ‘প্রক্রিয়াটি শুরু করতে যে যে পূর্বশর্ত দরকার ছিলো সবগুলো সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী কয়েকদিনের পণ্য রপ্তানির কাজ শুরু করা যাবে।’

আল জাজিরার কূটনৈতিক সম্পাদক জেমস বেস জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল। শস্য রপ্তানি শুরু হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন প্রচুর পরিমাণ গমের মজুদ রয়েছে। এগুলো বাজারজাত করতে অন্তত চার মাস সময় লেগে যেতে পারে।

চুক্তিটি যেভাবে বাস্তবায়ন করা হবে

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস বলেছেন, ইস্তাম্বুলে একটি যৌথ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (জেসিসি) থাকবে। যেখান থেকে শিপমেন্টের সময়সূচি এবং নিরীক্ষণ করা হবে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে- যৌথ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে সংস্থাটির কর্মকর্তা ছাড়াও তুরস্ক, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সামরিক কর্তাব্যক্তিরা থাকবেন।

ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে পেতে রাখা মাইন এড়াতে ইউক্রেনীয় নাবিকেরা নিরাপদ পথে শস্য পরিবহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিয়ে যাবে। যাওয়া ও আসার পথে সবপক্ষ জাহাজগুলোয় তল্লাশী চালাতে পারবে। রাশিয়া বা ইউক্রেন কোনো পক্ষই খাদ্যশস্য বহনকারী জাহাজে আক্রমণ চালাবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়া

রাশিয়া : রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু প্রতিশ্রুতি দেন, তিনটি বন্দর মাইন মুক্ত করা হচ্ছে। মস্কো কখনোই এই সুযোগ গ্রহণ করে বন্দরগুলো দিয়ে হামলা পরিচালনা করবে না। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন- সবপক্ষ চুক্তির শর্তাবলি মেনে চলবে।

ইউক্রেন : অবকাঠামো বিষয়ক মন্ত্রী ওলেকসান্দার কুবরাকভ বলেন, ‘আমরা রাশিয়াকে বিশ্বাস করি না। বিশ্বের কোনো দেশেরই তা করা উচিত। তবে কেবল জাতিসংঘের আশ্বাসে বিশ্বাস বাজি রেখে আমরা এ চুক্তিতে সম্মত হয়েছি।’

জাতিসংঘ : সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিয় গুতেরেস এ চুক্তিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ বলেছেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি কৃষ্ণ সাগরে আশার আলো জাগিয়েছে। অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো বলে মনে করেছেন গুতেরেস।

তুরস্ক : তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, এ চুক্তি বৈশ্বিক খাদ্য সংকট নিরসনের সম্ভবনা তৈরি করবে। পাশাপাশি এটি শান্তির আশা জাগাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন : ইইউ’র পররাষ্ট্র নীতির প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কমাতে এই চুক্তি এক ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’। তিনি আরও বলেন, ইইউ ইউক্রেনকে তার শস্য যতটা সম্ভব বৈশ্বিক বাজারে আনতে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র : হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জন কিরবি চুক্তিটি স্বাগত জানিয়েছেন। খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোয় দ্রুত খাদ্যশস্য রপ্তানি করতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com