মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, উপেক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত মিত্র আরব দেশগুলো, এমনকি মিত্র ইসরায়েলও ওয়াশিংটনের কথা শুনছে না
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত মিত্র আরব দেশগুলো, এমনকি মিত্র ইসরায়েলও ওয়াশিংটনের কথা শুনছে না সংগৃহীত ছবি

ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। একে শীতল যুদ্ধও বলা যেতে পারে। পুরোনো শীতল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলো এবার কোনো পক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগ্রহণ করেছে, যা আগে কখনোই দেখা যায়নি।

পুরোনো শীতল যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গত দুই দশক ছিলো ভয়াবহ। কারণ, অঞ্চলটি এ সময়ে ছিল বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনের যুদ্ধ থেমে গেছে। যেখানে কোনো পক্ষই একচেটিয়া জয় পায়নি। ফলে ক্লান্ত ও হতাশ আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতির ফলে সেখানে নতুন এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে। যা সৌদি আরবের জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন নয়টি আরব দেশের সম্মেলন এবং তেহরানে রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে চোখে পড়েছে।

জেদ্দা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। ওয়াশিংটনের অনুরোধ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অতিরিক্ত তেল উত্তোলনে রাজি হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে সবধরনের সহযোগিতা বন্ধে দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছেন বাইডেন। অধিকন্তু সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরকে অনুরোধ ও চাপ দেওয়ার পরেও তারা শিগগিরই রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

অথচ ১৯৮০ সালে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে আকুণ্ঠ সমর্থন করেছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী তেলের দাম কমিয়ে দিয়েছিল। সেসময় আফগানিস্তানে রুশ বাহিনী পরাজিত হওয়ার পেছনে প্রত্যক্ষ মদদ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। আর পেছন থেকে বড় ভূমিকা পালন করেছিল রিয়াদ। কিন্তু এখন বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন।

এবারের মধ্যপ্রাচ্য সফরে অঞ্চলটির ভিন্ন এক রূপ দেখেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। বুঝেছেন- আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে তড়িঘড়ি করে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। নানা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল অবস্থায় রেখে অঞ্চলটির বাইরে কূটনৈতিক মনযোগ বৃদ্ধি করায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে ওয়াশিংটন। পরিস্থিতি দেখে বাইডেন বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাচ্ছে না৷ কারণ, ওয়াশিংটন চায় না- চীন, রাশিয়া অথবা ইরান এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করুক।’

সংক্ষেপে

কোনো সন্দেহ নেই যে চীনের উত্থান ও রাশিয়ার পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে দুর্বল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আঞ্চলিক মিত্ররা জাতীয় স্বার্থে দেশটির সঙ্গ ত্যাগ করে রুশ ও চীনের প্রভাব বলয়ে ঢুকে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এতই তলনিতে পৌঁছে যে এই অঞ্চলে দেশটি সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও ওয়াশিংটনের অস্ত্র ও সাহায্য নিচ্ছে কিন্তু কোনো উপদেশ নিচ্ছে না। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মতো তুরস্কও এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতো। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম দুদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুঁকছেন এরদোয়ান। কয়েকদিন আগে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু ইরান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। সেখানে খামেনির কাছে অস্ত্রও বিক্রি করতে চেয়েছেন উচ্চাভিলাষী এই প্রেসিডেন্ট। এর আগে, ন্যাটোর কাছ থেকে শর্তের বেড়াজালে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনায় ব্যর্থ হয়ে ক্ষুব্ধ তুরস্ক শরণাপন্ন হয় মস্কোর। মার্কিন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাশিয়ার সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ ক্রয় করে এরদোয়ান প্রশাসন।

তুরস্ককে দেখে মার্কিন প্রভাব বলয় ভেঙে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সৌদি আরব, ইসরায়েল ও ইরান। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা চালানোর প্রস্তুতির মধ্যেই রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে গাঁটছাড় বাঁধার চেষ্টা করছে তেহরান। ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোয় বিপাকে পড়া রুশ প্রেসিডেন্টের কাছে ইরানও এক আশীর্বাদ। কারণ, সিরিয়ায় মার্কিন ও তুরস্কের প্রভাব মোকাবিলায় দেশটিকে দরকার পুতিনের।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী দুই দেশ ইরান ও সৌদি আরব। নানা বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নানা বিষয়ে উত্তেজনা প্রশমনে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দেশ দুটি।

শুধু তাই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকেও ডাইনামিক কূটনীতি দেখা যাচ্ছে। দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এ ছাড়া ইয়েমেন যুদ্ধ থেকেও নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে আমিরাত।

চিরশত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কাজ করছে ইরান। উদ্ভূত পরিস্থিতে বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য ও অঞ্চলটির আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে অভাবনীয় এক কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে। হয়তো দীর্ঘ মেয়াদে এই সম্পর্ক টিকে থাকবে না। তবে শান্তি ও স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য গড়তে এটিকে বড় এক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

মারওয়ান বিশারা, আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com